প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
আরব জাতি:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
আমেনার ইয়াছরিব গমন ও মৃত্যুবরণ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
প্রাণাধিক সন্তানকে কাছে পেয়ে আমেনা তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর কবর যেয়ারত করার মনস্থ করেন। শ্বশুর আব্দুল মুত্ত্বালিব সব ব্যবস্থা করে দেন। সেমতে পুত্র মুহাম্মাদ ও পরিচারিকা উম্মে আয়মনকে সাথে নিয়ে তিনি মক্কা থেকে প্রায় ৪৬০ কিঃ মিঃ উত্তরে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। অতঃপর যথাসময়ে মদীনায় পৌঁছে নাবেগা আল-জা‘দীর পারিবারিক গোরস্থানে স্বামীর কবর যেয়ারত করেন। অতঃপর সেখানে এক মাস বিশ্রাম নেন। এরপর পুনরায় মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিন্তু কিছু দূর এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ‘আবওয়া’ (الأَبْوَاء) নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। যা বর্তমানে মদীনা থেকে মক্কার পথে ২৫০ কিঃ মিঃ দূরে অবস্থিত একটি শহরের নাম। উম্মে আয়মন শিশু মুহাম্মাদকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এভাবে জন্ম থেকে পিতৃহারা ইয়াতীম মুহাম্মাদ মাত্র ৬ বছর বয়সে মাতৃহারা হ’লেন
শিশু মুহাম্মাদের কিছু বরকতমন্ডিত নিদর্শন:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
(১) ধাত্রীমাতা হালীমা সা‘দিয়াহ বলেন, ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। বাহন মাদী গাধাটির অবস্থাও ছিল করুণ। কেননা এ সময় আরব ভূমিতে দুর্ভিক্ষের বছর চলছিল। ফলে বেশী অর্থ পাবে না বলে ইয়াতীম মুহাম্মাদকে কেউ নিতে চাচ্ছিল না। অবশেষে আমি তাকে নিতে সম্মত হ’লাম। অতঃপর যখন তাকে বুকে রাখলাম, তখন সে এবং আমার গর্ভজাত সন্তান দু’জনে পেট ভরে আমার বুকের দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। ওদিকে উটনীর পালান দুধে ভরে উঠল। যার দুধ আমরা সবাই তৃপ্তির সাথে পান করলাম। তখন আমার স্বামী হারেছ বললেন, ‘হালীমা! আল্লাহর কসম! তুমি এক মহা ভাগ্যবান সন্তান লাভ করেছ’। তারপর বাড়ীতে ফিরে আসার সময় দেখা গেল যে, আমাদের সেই দুর্বল মাদী গাধাটি এত তেযী হয়ে গেছে যে, কাফেলার সবাইকে পিছনে ফেলে সে এগিয়ে যাচ্ছে। যা দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গেল।
(২) বাড়ীতে ফিরে এসে দেখা গেল আমাদের রাখাল যে চারণভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেত অন্যান্য রাখালরাও সেখানে তাদের পশুপাল নিয়ে যেত। কিন্তু তাদের পশুগুলো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরত। অথচ আমাদের পশুপাল তৃপ্ত অবস্থায় এবং পালানে দুধভর্তি অবস্থায় বাড়ী ফিরত। এভাবে আমরা প্রতিটি ব্যাপারেই বরকত লক্ষ্য করলাম এবং আমাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এল।[1]
(৩) কা‘বা চত্বরের যে নির্দিষ্ট স্থানটিতে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব বসতেন, সেখানে তার জন্য নির্দিষ্ট আসনে কেউ বসতো না। কিন্তু শিশু মুহাম্মাদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি এসে সরাসরি দাদার আসনেই বসে পড়তেন। তার চাচারা তাকে সেখান থেকে নামিয়ে দিতে চাইলে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব তাকে নিজের কাছেই বসাতেন ও গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলতেন, دَعُوا ابْنِي فَوَاللهِ إنَّ لَهُ لَشَأْنًا ‘আমার এ বেটাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম এর মধ্যে বিশেষ কিছু শুভ লক্ষণ আছে’।
উল্লেখ্য যে, ভাতীজার প্রশংসায় পঠিত আবু তালিবের কবিতা,
وَأَبْيَضَ يُسْتَسْقَى الْغَمَامُ بِوَجْهِهِ + ثِمَالَ الْيَتَامَى عِصْمَةً لِلأَرَامِلِ
‘শুভ্র দর্শন (মুহাম্মাদ) যার চেহারার অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। সে যে ইয়াতীমদের আশ্রয়স্থল ও বিধবাদের রক্ষক’ যা তিনি পাঠ করেছিলেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅত লাভের পর কুরাইশদের চরম হুমকির সময়। এর মাধ্যমে তিনি মক্কার নেতাদেরকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন এবং বলতে চেয়েছিলেন যে, কোন অবস্থাতেই তিনি মুহাম্মাদকে তাদের দাবী মতে তাদের হাতে ছেড়ে দিবেন না। ইবনু হিশাম বলেন, উক্ত প্রসঙ্গে আবু তালিব ৮০ লাইনের যে দীর্ঘ কবিতা পাঠ করেন, তা আমার নিকটে বিশুদ্ধভাবে এসেছে। তবে কোন কোন বিদ্বান এর অধিকাংশ কবিতা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন’ (ইবনু হিশাম ১/২৭২-৮০)।
এক্ষণে শিশুকালে তাঁকে নিয়ে চাচা কা‘বাগৃহে গিয়ে তাঁর অসীলায় এই দো‘আ করেছিলেন বলে ত্বাবাক্বাতে ইবনে সা‘দ, বায়হাক্বী দালায়েলুন নবুঅত প্রভৃতি গ্রন্থে যে বর্ণনা এসেছে তার সনদ ‘যঈফ’ (মা শা-‘আ ১৪-১৫ পৃঃ)। বরং মদীনাতে গিয়ে অনাবৃষ্টির সময় লোকদের দাবীর প্রেক্ষিতে জুম‘আর খুৎবায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে রাসূল (ছাঃ) বৃষ্টি প্রার্থনা করেছেন এবং সে বৃষ্টিতে মদীনা সিক্ত হয়েছে।[3] রাসূল (ছাঃ)-এর বৃষ্টি প্রার্থনার সময় আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) আবু ত্বালিবের পঠিত উপরোক্ত কবিতার লাইনটি পাঠ করতেন’।[4] ইবনু কাছীর (রহঃ) আবু ত্বালিবের পঠিত দীর্ঘ কবিতাকে বহুবিশ্রুত সাব‘আ মু‘আল্লাক্বার কবিতাসমূহের চাইতে অধিক উত্তম ও সারগর্ভ বলে মত প্রকাশ করেছেন’।[5] জনৈক বেদুঈন ব্যক্তির আবেদনক্রমে রাসূল (ছাঃ) মিম্বরে উঠে আল্লাহর নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করে বলেন, اللَّهُمَّ اسْقِنَا ‘হে আল্লাহ! আমাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণ কর’উক্ত হাদীছে এ কথাও রয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَوْ كَانَ أَبُو طَالِبٍ حَيًّا لَقَرَّتْ عَيْنَاهُ ‘যদি আজ আবু ত্বালিব বেঁচে থাকতেন, তাহ’লে তার দু’চক্ষু শীতল হয়ে যেত’ অতঃপর তিনি বলেন, কে আমাদেরকে তাঁর সেই কথাগুলি শুনাবে? তখন আলী (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সম্ভবতঃ আপনি তাঁর কবিতার সেই কথা বলছেন। যেখানে তিনি বলেছেন, وَأَبْيَضَ يُسْتَسْقَى الْغَمَامُ بِوَجْهِهِ (বায়হাক্বী, দালায়েল হা/২৩৮)ইবনু হাজার বলেন, وَإِنْ كَانَ فِيهِ ضَعْفٌ لَكِنَّهُ يَصْلُحُ لِلْمُتَابَعَةِ আনাস (রাঃ) বর্ণিত উক্ত হাদীছটির মধ্যে কিছু দুর্বলতা থাকলেও এটিকে সহযোগী হিসাবে গ্রহণ করা যায়’।[6]
উক্ত দীর্ঘ কবিতা সম্পর্কে সীরাতে ইবনে হিশামের ভাষ্যকার আব্দুর রহমান সুহায়লী (মৃ. ৫৮১ হি.) বলেন, আবু তালেব স্বীয় পিতা আব্দুল মুত্ত্বালিবের সময়ে এটা দেখেছেন যে, অনাবৃষ্টিতে কাতর মক্কাবাসীদের জন্য বৃষ্টি প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তিনি নারী-পুরুষ সবাইকে নিয়ে কা‘বাগৃহে জমা হন এবং আল্লাহর নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করেন। এ সময় শিশু মুহাম্মাদ তাঁর পাশে ছিল এবং তিনি তাকে কাঁধে তুলে নেন। অতঃপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হয় (ইবনু হিশাম ১/২৮১, টীকা-২) তবে উক্ত প্রার্থনায় আব্দুল মুত্ত্বালিব উপস্থিত নারী-পুরুষ সকলের দোহাই দিয়েছেন। অতএব উক্ত ঘটনায় মুহাম্মাদের পৃথক বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হয় না।
তিনি যখন পনের কিংবা বিশ বছর বয়সে উপনীত হন, তখন ‘ফিজার যুদ্ধ’(حَرْبُ الْفِجَارِ) শুরু হয়। এই যুদ্ধে একপক্ষে ছিল কুরায়েশ ও তাদের মিত্র বনু কিনানাহ এবং অপর পক্ষে ছিল ক্বায়েস আয়লান। যুদ্ধে কুরায়েশ পক্ষের জয় হয়। কিন্তু এ যুদ্ধের ফলে ‘হারাম’ মাস (যে মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ) এবং কা‘বার পবিত্রতা বিনষ্ট হয় বলে একে ‘হারবুল ফিজার’ বা দুষ্টুদের যুদ্ধ বলা হয়। তরুণ মুহাম্মাদ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং চাচাদের তীর যোগান দেবার কাজে সহায়তা করেন বলে যে বর্ণনা বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে রয়েছে, তা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। বরং এটাই সঠিক যে, আল্লাহপাক তাঁকে হারাম মাসে যুদ্ধে অংশগ্রহণের পাপ থেকে রক্ষা করেন। যেমন জন্ম থেকেই আল্লাহ তাঁকে সকল মন্দকর্ম থেকে রক্ষা করেছেন
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর নানামুখী অত্যাচার:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
সমস্ত যুক্তি, কৌশল ও আপোষ প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর কুরায়েশ নেতারা এবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপরে সরাসরি অত্যাচারের সিদ্ধান্ত নিল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দিক থেকে লোকদের ফিরিয়ে আনার জন্য কুরায়েশ নেতারা বিদ্রুপ করে বলে, আমরাও এরূপ বলতে পারি। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا قَالُوْا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَاءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هَـذَا إِنْ هَـذَا إِلاَّ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ- ‘যখন তাদের নিকটে আমাদের আয়াত সমূহ পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনেছি। ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি। এসব তো পূর্ববর্তীদের উপকথা ভিন্ন কিছুই নয়’ (আনফাল ৮/৩১)।
উক্ত আয়াতে কাফেররা ‘কুরআনকে পুরাকালের কাহিনী এবং ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি’ বলে দম্ভ প্রকাশ করেছে। অথচ অনুরূপ একটি কুরআন বা তার মত দু’একটি সূরা বা আয়াত জিন-ইনসান সকলকে একত্রিত হয়ে রচনা করে আনার জন্য মক্কায় পাঁচবার[1] এবং মদীনায় একবার(বাক্বারাহ ২/২৩-২৪) সহ মোট ছয়বার কাফেরদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু সে যুগে ও এ যুগে কেউ সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেনি। বরং দেখা গেছে যে, সে যুগে ঐসব নেতারাই গোপনে রাতের অন্ধকারে বাইরে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের ছালাতে রাসূল (ছাঃ)-এর কুরআন তেলাওয়াত শুনত। আবু সুফিয়ান, নযর বিন হারেছ, আখনাস বিন শারীক্ব, আবু জাহল প্রমুখ নেতারা একে অপরকে না জানিয়ে গোপনে একাজ করত’ (ইবনু হিশাম ১/৩১৫-১৬)। কিন্তু যখন তারা তাদের জনগণের সামনে যেত, তখন তাদের মন্তব্য পাল্টে যেত। কারণ তখন দুনিয়াবী স্বার্থ তাদেরকে সত্যভাষণ থেকে ফিরিয়ে রাখত। একই অবস্থা আজকালকের মুসলিম-অমুসলিম নেতাদের। যাদের অধিকাংশ রাসূল (ছাঃ) ও কুরআনের সত্যতাকে স্বীকার করে। কিন্তু বাস্তবে তা মানতে রাযী হয় না স্রেফ দুনিয়াবী স্বার্থের কারণে।
এভাবে কাফেররা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত নানারূপ মানসিক কষ্ট দেয়। এ সময় আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُوْلُوْنَوَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيْلاً ‘তারা যেসব কথা বলে, তাতে তুমি ছবর কর এবং তাদেরকে সুন্দরভাবে পরিহার করে চল’ (মুযযাম্মিল ৭৩/১০)। তিনি আরও বলেন,إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِئِيْنَ ‘বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমরাই তোমার জন্য যথেষ্ট’ (হিজর ১৫/৯৫)।
আরব জাতি:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মধ্যপ্রাচ্যের মূল অধিবাসী হ’লেন আরব জাতি। সেকারণ একে আরব উপদ্বীপ(جزيرة العرب) বলা হয়। আরবরা মূলতঃ তিনটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। ১. আদি আরব(العربُ البائدةُ) যারা আদ, ছামূদ, আমালেক্বা প্রভৃতি আদি বংশের লোক। যাদের বিস্তৃত ইতিহাস পাওয়া যায় না। ২. ক্বাহত্বানী আরব (العربُ العارِبَةُ)। যারা ইয়ামনের অধিবাসী। এরা ইয়া‘রাব বিন ইয়াশজাব বিন ক্বাহত্বানের বংশধর। ৩. ‘আদনানী আরব (العربُ الْمُسْتَعْرِبَةُ)। এরা ইরাক থেকে আগত ইবরাহীম-পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশোদ্ভূত ‘আদনান-এর বংশধর। এদের বংশেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্ম হয়।
আরবের অবস্থানস্থল:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
তিনদিকে সাগর বেষ্টিত প্রায় ১৩ লক্ষ বর্গমাইল ব্যাপী বিশ্বসেরা আরব উপদ্বীপ কেবল পৃথিবীর মধ্যস্থলেই অবস্থিত নয়, বরং এটি তখন ছিল চতুর্দিকের সহজ যোগাযোগস্থল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি। বর্তমান ফ্রান্সের প্রায় দ্বিগুণ এই বিশাল ভূখন্ডটির অধিকাংশ এলাকা মরুময়। অথচ এই ধূসর মরুর নীচে রয়েছে আল্লাহর রহমতের ফল্গুধারা বিশ্বের মধ্যে মূল্যবান তরল সোনার সর্বোচ্চ রিজার্ভ। এর পশ্চিমে লোহিত সাগর, পূর্বে আরব উপসাগর। যা গ্রীকদের নিকট পারস্য উপসাগর নামে খ্যাত। দক্ষিণে আরব সাগর (যা ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত অংশ) এবং উত্তরে সিরিয়া ও ইরাকের ভূখন্ড। পানিপথ ও স্থলপথে আরব উপদ্বীপ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ তিনটি মহাদেশের সাথে যুক্ত।
নবুঅতের কেন্দ্রস্থল::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
আদি পিতা আদম, নূহ, ইদ্রীস, হূদ, ছালেহ, ইবরাহীম, লূত্ব, ইসমাঈল, ইসহাক্ব, ইয়াকূব, শু‘আয়েব, মূসা, দাঊদ, সুলায়মান, ইলিয়াস, যাকারিয়া, ইয়াহইয়া ও ঈসা (‘আলাইহিমুস সালাম) এবং সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সহ সকল নবী ও রাসূলের আবির্ভাব ও কর্মস্থল ছিল মধ্যপ্রাচ্যের এই পবিত্র ভূখন্ড।
এর নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। তবে আমাদের ধারণায় প্রথম কারণ ছিল অনুর্বর এলাকা হওয়ায় এখানকার অধিবাসীগণ ব্যবসায়ে অভ্যস্ত ছিল। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার সঙ্গে আরবদের নিয়মিত বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। সেকারণ খুব সহজেই এখান থেকে নবুঅতের দাওয়াত সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত।
দ্বিতীয় কারণ হ’ল এই ভূখন্ডে ছিল দু’টি পবিত্র স্থানের অবস্থিতি। প্রথমটি ছিল মক্কায় বায়তুল্লাহ বা কা‘বাগৃহ। যা হযরত আদম (আঃ) কর্তৃক প্রথম নির্মিত হয়। অতঃপর ইবরাহীম ও তৎপুত্র ইসমাঈলের হাতে পুনর্নির্মিত হয়। দ্বিতীয়টি ছিল বায়তুল মুক্বাদ্দাস, যা কা‘বাগৃহের চল্লিশ বছর পর আদম-পুত্রগণের কারু হাতে প্রথম নির্মিত হয়, যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-এর পৌত্র ইয়াকূব বিন ইসহাক (আঃ) কর্তৃক নির্মিত হয়। অতঃপর দাউদ ও সুলায়মান (আঃ) কর্তৃক পুনর্নির্মিত হয়। ইবরাহীমপুত্র ইসমাঈল-এর বংশধরগণ মক্কা এলাকা আবাদ করেন। তাঁরাই বংশ পরম্পরায় বায়তুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ, হাজী ছাহেবদের জান-মালের হেফাযত এবং তাদের পানি সরবরাহ, আপ্যায়ন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর বংশধরগণ বায়তুল মুক্বাদ্দাস তথা আজকের ফিলিস্তীন এলাকায় বসবাস করেন। ইসহাক-পুত্র ইয়াকূব (আঃ)-এর অপর নাম ছিল ‘ইস্রাঈল’ (إسرائيل বা ‘আল্লাহর দাস’) সেকারণ তাঁর বংশধরগণ ‘বনু ইস্রাঈল’ নামে পরিচিত। এভাবে আরব উপদ্বীপের দুই প্রধান এলাকা সহ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর বনু ইসমাঈল ও বনু ইস্রাঈল কর্তৃক তাওহীদের দাওয়াত প্রসার লাভ করে। সাথে সাথে তাদের সম্মান ও প্রতিপত্তি সর্বত্র বিস্তৃত হয়। আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوْحاً وَآلَ إِبْرَاهِيْمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِيْنَ- ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ-‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মনোনীত করেছেন আদম ও নূহকে এবং ইবরাহীম পরিবার ও ইমরান পরিবারকে জগদ্বাসীর মধ্য হ’তে’। ‘তারা একে অপরের সন্তান। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (আলে ইমরান ৩/৩৩-৩৪; আনকাবূত ২৯/২৭) ইমরান ছিলেন মূসা (আঃ)-এর পিতা অথবা মারিয়াম-এর পিতা। সকলের মূল পিতা হ’লেন আবুল আম্বিয়া ইবরাহীম (আঃ) পৃথকভাবে ‘আলে ইমরান’ বলার মাধ্যমে মূসা ও ঈসা (আঃ)-এর বিশাল সংখ্যক উম্মতকে বুঝানো হয়েছে। আর ইবরাহীম (আঃ)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে শেষনবী ও শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটেছে। যাঁর উম্মত সংখ্যা দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বাধিক।
রাজনৈতিক অবস্থা ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
আরবভূমি মরুবেষ্টিত হওয়ায় তা সর্বদা বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে নিরাপদ ছিল। ফলে এরা জন্মগতভাবে স্বাধীন ছিল। এই সময় আরবের দক্ষিণাংশে ছিল হাবশার সাম্রাজ্য, পূর্বাংশে ছিল পারসিক সাম্রাজ্য এবং উত্তরাংশের ভূখন্ডসমূহ ছিল রোমক সাম্রাজ্যের করতলগত। সম্রাট শাসিত এইসব অঞ্চলের অধিবাসীরা সবাই ছিল ধর্মের দিক দিয়ে খ্রিষ্টান। যদিও প্রকৃত ধর্ম বলতে সেখানে কিছুই ছিল না। মক্কা ও ইয়াছরিব (মদীনা) সহ আরবের বাকী ভূখন্ডের লোকেরা স্বাধীন ছিল। তাদের কোন কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল না। তবে তারা গোত্রপতি শাসিত ছিল।
ধর্মীয় অবস্থা::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
এ ব্যাপারে জানার জন্য কুরআনই বড় উৎস। সে বর্ণনা অনুযায়ী জাহেলী যুগের আরবরা আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের জন্য মনগড়া উপাস্য সমূহ নির্ধারণ করেছিল (ইউনুস ১০/১৮) তারা আল্লাহকে স্বীকার করত। সেই সাথে সুফারিশকারী হিসাবে অন্যদের উপাস্য মানত (আন‘আম ৬/১৯) ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তারা মূর্তিগুলিকে তাদের পূজিত ব্যক্তিদের ‘রূহের অবতরণ স্থল সমূহ’ (مَنَازِلُ الْأَرْوَاحِ) বলে মনে করত। মূর্তিপূজা তাদের আক্বীদা ও সমাজ-সংস্কৃতিতে মিশে গিয়েছিল। যুগ পরম্পরায় তারা এই আক্বীদায় বিশ্বাসী ও রীতি-নীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল (যুখরুফ ৪৩/২২) তারা কা‘বা গৃহে মূর্তি স্থাপন করেছিল এবং হজ্জের অনুষ্ঠানসমূহে পরিবর্তন এনেছিল। তাওয়াফের জন্য ‘হারামের পোষাক’ (ثِيَابُ الْحَرَمِ) নামে তারা নতুন পোষাক পরিধানের রীতি চালু করেছিল। নইলে লোকদের নগ্ন হয়ে তাওয়াফ করতে হ’ত। কুরায়েশরা মূর্তিপূজা করত। সেই সাথে নিজেদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর একান্ত অনুসারী হিসাবে ‘হানীফ’ (حَنِيْف) ‘একনিষ্ঠ একত্ববাদী’ বলত। এছাড়া তারা নিজেদেরকে ‘হুম্স’ (حُمْس), ‘ক্বাত্বীনুল্লাহ’ (قَطِيْنُ اللهِ) ‘আহ্লুল্লাহ’ (أَهْلُاللهِ) এবং ‘আল্লাহর ঘরের বাসিন্দা’ (أَهْلُ بَيْتِ اللهِ) বলে দাবী করত’।[1] সেকারণ তারা মুযদালিফায় হজ্জ করত, আরাফাতের ময়দানে নয়। কেননা মুযদালিফা ছিল হারামের অন্তর্ভুক্ত এবং আরাফাত ছিল হারাম এলাকার বাইরে। যেখানে বহিরাগত হাজীরা অবস্থান করত। ইসলাম আসার পর এই প্রথা নিষিদ্ধ করা হয় এবং সকলকে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করতে বলা হয় (বাক্বারাহ ২/১৯৯)।
তারা হজ্জের মাস সমূহে ওমরাহ করাকে ‘সবচাইতে নিকৃষ্ট কাজ’ (أَفْجَرُ الْفُجُوْر) বলে ধারণা করত। তারা কা‘বাগৃহে ইবাদতের সময় শিস দিত ও তালি বাজাতো তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে পরিবর্তন এনেছিল (আ‘রাফ ৭/১৮০) তারা জিনদেরকে আল্লাহর শরীক নির্ধারণ করেছিল (আন‘আম ৬/১০০) এবং ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলত (নাহল ১৬/৫৭) তারা তাকদীরকে এবং কিয়ামতকে অস্বীকার করত(আন‘আম ৬/১৪৮; নাহল ১৬/৩৮) তারা ইবাদত করত, কুরবানী করত বা মানত করত আখেরাতে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে নয়, বরং দুনিয়াবী স্বার্থ হাছিলের জন্য। তারা মৃত্যু ও অন্য বিপদাপদকে আল্লাহর দিকে নয় বরং প্রকৃতির দিকে সম্বন্ধ করত (জাছিয়াহ ৪৫/২৩) তারা মূর্তির সম্মানে কুরবানী চালু করেছিল (মায়েদাহ ৫/৩)। লাত ও ‘উযযার নামে কসম করত এবং নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করত’ (বুখারী হা/৩৮৫০)।
আরবদের বিশ্বাস ছিল যে, প্রতি ১৩ দিন পর একটি নক্ষত্র পশ্চিমে অস্ত যায় এবং একই সাথে পূর্ব দিকে একটি নক্ষত্র উদিত হয়। তাদের বিশ্বাস মতে উক্ত নক্ষত্র অস্ত যাওয়ার সময় অবশ্যই বৃষ্টি হয় অথবা ঠান্ডা হাওয়া প্রবাহিত হয়। সেকারণ বৃষ্টি হ’লে তারা উক্ত নক্ষত্রের দিকে সম্বন্ধ করে বলত,مُطِرْنَابِنَوْءٍ كَذَا ‘আমরা উক্ত নক্ষত্রের কারণে বৃষ্টি প্রাপ্ত হয়েছি’।[2] আল্লাহর হুকুমে যে বৃষ্টি হয় এটা তারা বিশ্বাস করত না। এভাবে তারা তাওহীদ বিশ্বাস থেকে বহু দূরে চলে গিয়েছিল। অথচ এটাই ছিল তাদের পিতা ইবরাহীমের মূল দাওয়াত।
তাদের চরিত্রে ও রীতি-নীতিতে এমন বহু কিছু ছিল যা ইসলামকে ধসিয়ে দিত। যেমন বংশগৌরব করা ও অন্য বংশকে তাচ্ছিল্য করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَرْبَعٌ فِى أُمَّتِى مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لاَ يَتْرُكُونَهُنَّ الْفَخْرُ فِى الأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِى الأَنْسَابِ وَالاِسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُوْمِ وَالنِّيَاحَةُ ‘আমার উম্মতের মধ্যে চারটি বস্ত্ত রয়েছে জাহেলিয়াতের অংশ, যা তারা ছাড়েনি। আভিজাত্য গৌরব, বংশের নামে তাচ্ছিল্য করা, নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং শোক করা’।[3] জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল, পিতা-মাতার কাজের উপর বড়াই করা, মাসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে গর্ব করা (তওবা ৯/১৯, ৫৫) ধনশালী ব্যক্তিদের সম্মানিত মনে করা (যুখরুফ ৪৩/৩১) এবং দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণীকে হীন মনে করা (আন‘আম ৬/৫২) যেকোন কাজে শুভাশুভ নির্ধারণ করা ও ভাগ্য গণনা করা (জিন ৭২/৬) ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে অনেক জাহেলী কবির মধ্যে তাওহীদের আক্বীদা ছিল। যেমন মু‘আল্লাক্বা খ্যাত কবি যুহায়ের বিন আবী সুলমা ও কবি লাবীদ বিন রাবী‘আহ প্রমুখ।[4] কা‘বাগৃহে হজ্জ জারী ছিল। হারামের মাসগুলির পবিত্রতা বজায় ছিল। অদৃষ্টবাদের আধিক্য থাকলেও তাদের মধ্যে ক্বাযা ও ক্বদরের আক্বীদা মওজুদ ছিল। ইবরাহীমী দ্বীনের শিক্ষা ও ইবাদতের কিছু নমুনা মক্কা ও তার আশপাশে জাগরুক ছিল। তাদের মধ্যে সততা, বিশ্বস্ততা, সাহসিকতা, আতিথেয়তা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা প্রভৃতি অনন্য গুণাবলী অক্ষুণ্ণ ছিল।
সামাজিক অবস্থা:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
(ক) গোত্রীয় সমাজ ব্যবস্থা (المجتمع القبائلى) : আরবদের সামাজিক ব্যবস্থা ছিল গোত্রপ্রধান। যার কারণে বংশীয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হ’ত। মারামারি ও হানাহানিতে জর্জরিত উক্ত সমাজে কেবল গোত্রীয় ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধনের উপর নির্ভর করেই তাদের টিকে থাকতে হ’ত। ন্যায়-অন্যায় সবকিছু নির্ণীত হ’ত গোত্রীয় স্বার্থের নিরিখে। আজকালকের কথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাজব্যবস্থায় যে উৎকট দলতন্ত্র আমরা লক্ষ্য করছি, তা জাহেলী আরবের গোত্রীয় সমাজব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটা তুলনীয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের চাইতে নিম্নতর অবস্থায় পৌঁছে গেছে। গোত্র সমূহের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। সেকারণ তারা অধিক সংখ্যায় পুত্র সন্তান কামনা করত। অধিক সংখ্যক ভাই ও পুত্র সন্তানের মালিককে সবাই সমীহ করত। যুদ্ধে পরাজিত হ’লে অন্যান্য সম্পদের সাথে নারীদের লুট করে নিয়ে যাওয়ার ভয়ে অথবা দরিদ্রতার কারণে অনেকে তাদের কন্যাসন্তানকে শিশুকালেই হত্যা করে ফেলত। তাদের কোন গোত্রীয় আর্থিক রিজার্ভ ছিল না। যুদ্ধ শুরু হ’লে সবাই প্রয়োজনীয় ফান্ড গোত্রনেতার কাছে জমা দিত ও তা দিয়ে যুদ্ধের খরচ মেটাত। তবে পূর্ব থেকে ধর্মীয় রীতি চলে আসার কারণে তারা বছরে চারটি সম্মানিত মাসে (যুল-ক্বা‘দাহ, যুলহিজ্জাহ, মুহাররম ও রজব) যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখতো। এটা ছিল তাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় রক্ষাকবচ। গোত্রনেতাগণ একত্রে বসে সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা করা, কোন গোত্রের সাথে যুদ্ধ শুরু বা শেষ করা কিংবা সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতেন। মক্কার ‘দারুন নাদওয়া’ (دار الندوة) ছিল এজন্য বিখ্যাত।[1] তাদের মধ্যে মদ্যপানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যুদ্ধ ও পেশীশক্তিই ছিল বিজয় লাভের মানদন্ড। আরবের সামাজিক অবস্থাকে এক কথায় বলতে গেলে Might is Right তথা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে পরিচালিত হ’ত। আজকের বিশ্ব ব্যবস্থা তার চাইতে মোটেও উন্নত নয়। পাঁচটি ‘ভেটো’ ক্ষমতাধারী রাষ্ট্রই বলতে গেলে বিশ্ব শাসন করছে।
(খ) অর্থনৈতিক অবস্থা (الاقتصاد) : ব্যবসা ছিল তাদের প্রধান অবলম্বন। ত্বায়েফ, সিরিয়া, ইয়ামন প্রভৃতি উর্বর ও উন্নত এলাকা ছাড়াও সর্বত্র পশু-পালন জনগণের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল। উট ছিল বিশেষ করে দূরপাল্লার সফরের জন্য একমাত্র স্থল পরিবহন। গাধা, খচ্চর মূলতঃ স্থানীয় পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হ’ত। ঘোড়া ছিল যুদ্ধের বাহন। মক্কার ব্যবসায়ীরা শীতকালে ইয়ামনে ও গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় দূরপাল্লার ব্যবসায়িক সফর করত। আর্থিক লেনদেনে সূদের প্রচলন ছিল। তারা চক্রবৃদ্ধি হারে পরস্পরকে সূদভিত্তিক ঋণ দিত। রাস্তা-ঘাটে প্রায়ই ব্যবসায়ী কাফেলা লুট হ’ত। সেজন্য সশস্ত্র যোদ্ধাদল নিয়ে তারা রওয়ানা হ’ত। তবে কা‘বাগৃহের খাদেম হওয়ার সুবাদে মক্কার ব্যবসায়ী কাফেলা বিশেষভাবে সম্মানিত ছিল এবং সর্বত্র নিরাপদ থাকত। বছরের আট মাস লুটতরাজের ভয় থাকলেও হারামের চার মাসে তারা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করত। এই সময় ওকায, যুল-মাজায, যুল-মাজান্নাহ প্রভৃতি বড় বড় বাজারে বাণিজ্যমেলা ছাড়াও আরবের বিভিন্ন প্রান্তে আরও অনেকগুলি বড় বড় মেলা বসত। এইসব বাণিজ্য মেলায় প্রচুর বেচাকেনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা লাভবান হ’ত। তাদের মধ্যে বস্ত্র, চর্ম ও ধাতব শিল্পের প্রচলন ছিল। ইয়ামন, হীরা, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চল এইসব শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল। তবে গৃহের আঙিনায় বসে সূতা কাটার কাজে অধিকাংশ আরব মহিলা নিয়োজিত থাকতেন। কোন কোন এলাকায় কৃষিকাজ হ’ত। ছোলা, ভুট্টা, যব ও আঙ্গুরের চাষ হ’ত। মক্কা-মদীনায় গমের আবাদ ছিল না। মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর খেলাফতকালে প্রথম সিরিয়া থেকে মদীনায় গম রফতানী হয়। খেজুর বাগান ব্যাপক হারে দেখা যেত। খেজুর ছিল তাদের অন্যতম প্রধান উপজীবিকা।
তাদের কোন গোত্রীয় অর্থনৈতিক ফান্ড ছিল না। সেকারণ সমাজের লোকদের দারিদ্র্য ও রোগ-ব্যধি দূরীকরণে ও স্বাস্থ্যসেবার কোন সমন্বিত কর্মসূচী ও কর্মপরিকল্পনা তাদের ছিল না। ফলে পারস্পরিক দান ও বদান্যতার উপরেই তাদের নির্ভর করতে হ’ত। নিখাদ পুঁজিবাদী অর্থনীতি চালু ছিল। যার ফলে সমাজে একদল উচ্চবিত্ত থাকলেও অধিকাংশ লোক ছিল বিত্তহীন। সাধারণ অবস্থা ছিল এই যে, আরবদের সহায়-সম্পদ তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয়িত না হয়ে সিংহভাগই ব্যয়িত হ’ত যুদ্ধ-বিগ্রহের পিছনে। ফলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। আরবীয় সমাজে উচ্চবিত্ত লোকদের মধ্যে মদ-জুয়া ইত্যাদির ব্যাপক প্রচলন ছিল। সেখানে বিত্তহীনরা দাস ও দাসীরূপে বিক্রয় হ’ত ও মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হ’ত।
কুরায়েশরা পরস্পরে ব্যবসায়ে জড়িত ছিল। হাশেম বিন ‘আব্দে মানাফ গোত্রনেতাদের মধ্যে এই পারস্পরিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। যা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আবির্ভাবকালীন সময় পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যাকে ‘ঈলাফ’ (إيلاف) বলা হয়। যারা শীতকালে ইয়ামনে ও গ্রীষ্মকালে শামে ব্যবসায়িক সফর করত। একথাটিই কুরআনে এসেছে সূরা কুরায়েশ-এ। তারা সমুদ্র পথে চীন ও হিন্দুস্থানেও ব্যবসা করত।
হাশেম বিন ‘আব্দে মানাফ তৎকালীন দুই বিশ্বশক্তি রোম ও পারস্য সম্রাটদের সাথে চুক্তিক্রমে তাদের দেশেও ব্যবসা পরিচালনা করেন। এভাবে মক্কার অর্থনীতির ভিত গড়ে ওঠে ব্যবসার উপরে। অস্ত্র শিল্প ও আসবাবপত্র শিল্প ব্যতীত তেমন কোন শিল্প তাদের মধ্যে ছিল না। অর্থনীতির অন্য একটি ভিত্তি ছিল পশু পালন। যা ছিল আপামর জনসাধারণের নাগালের মধ্যে। ব্যবসায়ী নেতারা সূদের ভিত্তিতে ঋণদান করত। ফলে সেখানে ধনী ও গরীবের মধ্যে পাহাড় প্রমাণ বৈষম্য সৃষ্টি হয়। মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণী বিলাস-ব্যসনের মধ্যে বসবাস করলেও মক্কায় অধিকাংশ অধিবাসী ছিল নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন। মক্কার নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীগণ সারা আরবে সম্মানিত ছিলেন। কা‘বাগৃহের কারণে তাদের মর্যাদা সর্বত্র সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই সাথে মক্কা ছিল সর্বদা বহিঃশক্তির হামলা থেকে সুরক্ষিত।
(গ) নারীদের অবস্থা (حالة النساء) : তৎকালীন আরবে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন বসবাস করত। সেখানকার অভিজাত শ্রেণীর লোকদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে খুবই উন্নত ছিল। পরিবারে পুরুষ ও মহিলাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার উপরে প্রতিষ্ঠিত। অভিজাত পরিবারের মহিলাদের মান-সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা হ’ত। তাদের মর্যাদা হানিকর কোন অবস্থার উদ্ভব ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তরবারি কোষমুক্ত হয়ে যেত। মহিলাদের মর্যাদা এতই উঁচুতে ছিল যে, বিবদমান গোত্রগুলিকে একত্রিত করে সন্ধিচুক্তি সম্পাদনেও তারা সক্ষম হ’ত। পক্ষান্তরে তাদের উত্তেজিত বক্তব্যে ও কাব্য-গাথায় যেকোন সময় দুই গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারত। ওহোদের যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা তার সাথী মহিলাদের নিয়ে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে একাজটিই করেছিলেন। তাদের মধ্যে বিবাহ পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত উঁচু মানের। উভয় পক্ষের অভিভাবকগণের সম্মতি ও কনের স্বীকৃতি লাভের পর বর কনেকে নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করতে পারত। বিয়েতে ও সন্তানের আকীকাতে সমাজনেতাদের দাওয়াত দিয়ে ধুমধামের সাথে অনুষ্ঠান করা তাদের সামাজিক রেওয়াজ ছিল।
সাধারণ ও দরিদ্র শ্রেণীর আরবদের মধ্যে চার ধরনের বিবাহ চালু ছিল। এক ধরনের ছিল অভিজাত শ্রেণীর মত পারস্পরিক সম্মতি ও মোহরানার বিনিময়ে বিবাহ পদ্ধতি। কিন্তু বাকী তিনটি পদ্ধতিকে বিবাহ না বলে স্পষ্ট ব্যভিচার বলা উচিত। যা ভারতীয় হিন্দু সমাজে রাক্ষস বিবাহ, গান্ধর্ব্য বিবাহ ইত্যাদি নামে আধুনিক যুগেও চালু আছে বলে জানা যায়। আরবীয় সমাজে স্বাধীনা ও দাসী দু’ধরনের নারী ছিল। স্বাধীনাগণ ছিলেন সম্মানিত। কিন্তু দাসীরা বাজার-ঘাটে বিক্রয় হ’ত। মনিবের দাসীবৃত্তিই ছিল তাদের প্রধান কাজ।
(ঘ) নৈতিক অবস্থা (الأخلاق) : উদার মরুচারী আরবদের মধ্যে নৈতিকতার ক্ষেত্রে দু’টি ধারা একত্রে পরিলক্ষিত হ’ত। একদিকে যেমন তাদের মধ্যে মদ্যপান, ব্যভিচার, মারামারি ও হানাহানি লেগে থাকত। অন্যদিকে তেমনি দয়া, উদারতা, সততা, পৌরুষ, সৎসাহস, ব্যক্তিত্ববোধ, সরলতা ও অনাড়ম্বরতা, দানশীলতা, আমানতদারী, মেহমানদারী, প্রতিজ্ঞা পরায়ণতা ইত্যাদি সদগুণাবলীর সমাবেশ দেখা যেত। তাদের মধ্যে দুঃসাহসিকতা ও বেপরোয়া ভাবটা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশী। তাদের মধ্যে যেমন অসংখ্য দোষ-ত্রুটি ছিল, তেমনি ছিল অনন্যসাধারণ গুণাবলী, যা অন্যত্র কদাচিৎ পাওয়া যেত। তাদের সৎসাহস, আমানতদারী, সত্যবাদিতা, কাব্য প্রতিভা, স্মৃতিশক্তি, অতিথিপরায়ণতা ছিল কিংবদন্তীর মত। তাদের কাব্যপ্রিয়তা এবং উন্নত কাব্যালংকারের কাছে আধুনিক যুগের আরবী কবি-সাহিত্যিকরা বলতে গেলে কিছুই নয়। তাদের স্মৃতিশক্তি এত প্রখর ছিল যে, একবার শুনলেই হুবহু মুখস্থ বলে দিত। বড় বড় ক্বাছীদা বা দীর্ঘ কবিতাগুলি তাদের মুখে মুখেই চালু ছিল। লেখাকে এজন্য তারা নিজেদের জন্য হীনকর মনে করত। দুর্বল স্মৃতির কারণে আজকের বিশ্ব লেখাকেই অধিক গুরুত্ব দেয়। অথচ লেখায় ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৎকালীন আরবদের স্মৃতিতে ভুল কদাচিৎ হ’ত। সম্ভবতঃ এই সব সদগুণাবলীর কারণেই বিশ্বনবীকে আল্লাহ মক্কাতে প্রেরণ করেন। যাদের প্রখর স্মৃতিতে কুরআন ও হাদীছ অবিকৃত অবস্থায় নিরাপদ থাকে এবং পরবর্তীতে তা লিখিত আকারে সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়। যদিও কুরআন ও হাদীছ লিখিতভাবেও তখন সংকলিত হয়েছিল।
উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল আরব ভূখন্ডের মরুচারী মানুষেরা বিভিন্ন দুর্বলতার অধিকারী হ’লেও তাদের মধ্যে উন্নত মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঈর্ষণীয়ভাবে পরিদৃষ্ট হ’ত। আদি পিতা-মাতা আদম ও হাওয়ার অবতরণস্থল হওয়ার কারণে এই ভূখন্ড থেকেই মানব সভ্যতা ক্রমে পৃথিবীর অন্যান্য ভূখন্ডে বিস্তার লাভ করেছে। এই ভূখন্ডে আরাফাত-এর না‘মান উপত্যকায় সৃষ্টির সূচনায় আল্লাহ পাক সমস্ত মানবকুলের নিকট হ’তে তাঁর প্রভুত্বের স্বীকৃতি ও তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন।[2] যা ‘আহ্দে আলাস্ত্ত’ নামে খ্যাত। একই সাথে তিনি সকল নবীর কাছ থেকে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপরে ঈমান আনা ও তাঁকে সর্বতোভাবে সহযোগিতার অঙ্গীকার নেন (আলে ইমরান ৩/৮১)।
এই ভূখন্ডেই হাযার হাযার নবী ও রাসূলের আগমন ঘটেছে। এই ভূখন্ডেই আল্লাহর ঘর কা‘বাগৃহ এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাস অবস্থিত। এই ভূখন্ড বাণিজ্যিক কারণে সারা বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। জান্নাতের ভাষা আরবী এই ভূখন্ডের কথিত ও প্রচলিত ভাষা ছিল। সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা, প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং সততা ও আমানতদারীর অনুপম গুণাবলীর প্রেক্ষাপটে আরবভূমির কেন্দ্রবিন্দু মক্কাভূমির অভিজাত বংশ কা‘বাগৃহের তত্ত্বাবধায়ক ও রক্ষণাবেক্ষণকারীদের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর নিকটেই আল্লাহ মানবজাতির কল্যাণে প্রেরিত সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠতম নে‘মত কুরআন ও সুন্নাহর পবিত্র আমানত সমর্পণ করেন। ফালিল্লা-হিল হাম্দ ওয়াল মিন্নাহ।
শিক্ষণীয় বিষয়:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
(১) বিশ্বনবী ও শেষনবী হবার কারণেই বিশ্বকেন্দ্র মক্কাতে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রেরণ করা হয়।
(২) সারা বিশ্বে তাওহীদের দাওয়াত দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন বিশ্বের সেরা বাণিজ্য কেন্দ্র ও যোগাযোগ কেন্দ্র আরব ভূখন্ডে শেষনবী প্রেরিত হন।
(৩) জান্নাতের ভাষা আরবী। আর সেই ভাষাতেই কুরআন নাযিল হয়েছে। তাই আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক শুদ্ধভাষী আরব তথা কুরায়েশ বংশে শেষনবীর আগমন ঘটে। যাতে তিনি জান্নাতী ভাষায় মানবজাতিকে তার মূল আবাস জান্নাতের পথে আহবান জানাতে পারেন।
(৪) আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র সে যুগে ছিল না। তাই প্রখর স্মৃতিধর আরবদের নিকটেই কুরআন ও সুন্নাহর অমূল্য নে‘মত সংরক্ষণের আমানত সোপর্দ করা হয়।
(৫) আরবরা ছিল আজন্ম স্বাধীন ও বীরের জাতি। সেকারণ বলা চলে যে, তৎকালীন রোমক ও পারসিক পরাশক্তির মুকাবিলায় ইসলামী খেলাফতের সফল বাস্তবায়নের জন্য শেষনবীর আগমনস্থল ও কর্মস্থল হিসাবে আরব ভূখন্ডকে বেছে নেওয়া হয়।
মক্কা ও ইসমাঈল বংশ ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মক্কায় প্রথম অধিবাসী ছিলেন মা হাজেরা ও তাঁর সন্তান ইসমাঈল। পরে সেখানে আসেন ইয়ামন থেকে ব্যবসায়ী কাফেলা বনু জুরহুম। তারা হাজেরার অনুমতিক্রমে যমযম কূপের পাশে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ইসমাঈল তাদের বংশে বিয়ে করেন। অতঃপর ইবরাহীম ও ইসমাঈলের হাতে কা‘বাগৃহ নির্মিত হয়। অতঃপর ইসমাঈলের বংশধরগণই মক্কাভূমি ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ আবাদ করেন। তাদের মাধ্যমেই সর্বত্র তাওহীদের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ে।
ইসমাঈল (আঃ) আজীবন স্বীয় বংশের নবী ও শাসক ছিলেন। তাঁর পরে তাঁর পুত্র ও বংশধরগণই মক্কা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা শাসন করেন এবং কা‘বাগৃহের তত্ত্বাবধানের পবিত্র দায়িত্ব পালন করেন।
ইসমাঈল-পুত্র নাবেত (نَابِت)-এর বংশধরগণ উত্তর হেজায শাসন করেন। তাদের বংশধর ছিলেন ইয়াছরিবের আউস ও খাযরাজ গোত্র। ইসমাঈলের অন্য পুত্র ক্বায়দার (قيدار)-এর বংশধরগণ মক্কায় বসবাস করেন এবং পরবর্তীতে তাদেরই অন্যতম বিখ্যাত নেতা ছিলেন ‘আদনান (عَدنان)। যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ২১তম ঊর্ধ্বতন পুরুষ।
মক্কার অবস্থান ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মক্কাকে পৃথিবীর নাভিস্থল (وَسَطُ الْأَرْضِ) বলা হয়। কুরআনে একে ‘উম্মুল ক্বোরা’ (أُمُّ الْقُرَى) বা ‘আদি জনপদ’ বলা হয়েছে (আন‘আম ৬/৯২; শূরা ৪২/৭)। مَكَّة অর্থ ধ্বংসকারী। مَكَّ يَمُكُّ مَكًّا অর্থ ধ্বংস করা। মক্কাকে মক্কা বলার কারণ দু’টি। এক- জাহেলী যুগে এখানে কোন যুলুম ও অনাচার টিকতে পারতনা। যেই-ই কোন যুলুম করত, সেই-ই ধ্বংস হয়ে যেত। এজন্য এর অন্য একটি নাম ছিল ‘না-সসাহ’ (النَّاسَّةَ) অর্থ বিতাড়নকারী, বিশুদ্ধকারী। কোন রাজা-বাদশা যখনই একে ধ্বংস করতে গিয়েছে, সেই-ই ধ্বংস হয়েছে। এর অন্য একটি নাম হ’ল বাক্কা (بَكَّةٌ)। যার দু’টি অর্থ রয়েছে। এক- بَكَّ يَبُكُّ بَكًّااى كَسَرَ ভেঙ্গে দেওয়া। সেকারণেই বলা হয়,لِأَنَّهَا تَبُكُّ أَعْنَاقَ الْجَبَابِرَةِ إذَا أَحْدَثُوا فِيْهَا شَيْئًا ‘এটি প্রতাপশালী অহংকারীদের ঘাড় মটকিয়ে দেয়, যখন তারা এখানে কিছু অঘটন ঘটাতে চায়’ দুই- এর অর্থ اِزْدَحَمَ ভিড় করা ও কান্নাকাটি করা। কেননা মানুষ এখানে এসে জমা হয় এবং আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করে’(ইবনু হিশাম ১/১১৪)।
জাহেলী যুগে হামলাকারী কাফের নেতা ইয়ামনের খ্রিষ্টান গভর্ণর আবরাহাকে আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করেছেন। কিন্তু ইসলামী যুগে মুসলিম যালেমদের আল্লাহ সাথে সাথে ধ্বংস করেননি তাদের ঈমানের কারণে। তাদের কঠিন শাস্তি পরকালে হবে, যদি নাকি তারা তওবা না করে মৃত্যুবরণ করে। আজও যদি কোন কাফের শক্তি কা‘বা ধ্বংস করতে চায়, সে আল্লাহর গযবে সাথে সাথেই ধ্বংস হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। যেমন আল্লাহ বলেন, أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَاحَرَمًا آمِنًا وَيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ ‘তারা কি দেখেনা যে, আমরা হারামকে নিরাপদ করেছি। অথচ তাদের চতুষ্পার্শ্বে যারা আছে তারা উৎখাত হয়’(আনকাবূত ২৯/৬৭) তিনি আরও বলেন, وَمَنْ يُرِدْ فِيْهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ ‘যে ব্যক্তি এখানে (হারামে) সীমালংঘনের মাধ্যমে পাপকার্যের সংকল্প করে, আমরা তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাবো’ (হজ্জ ২২/২৫)।[1]
চারপাশে পাহাড় ঘেরা উপত্যকায় অবস্থিত মক্কা নগরী। পূর্ব দিকে আবু কুবাইস (أبو قُبَيس) পাহাড় এবং পশ্চিম দিকে কু‘আইক্বা‘আন (قُعَيْقَعان) পাহাড় নতুন চাঁদের মত মক্কাকে বেষ্টন করে রেখেছে। এর নিম্নভূমিতে কা‘বাগৃহ অবস্থিত। যার চারপাশে কুরায়েশদের জনবসতি। নবচন্দ্রের দুই কিনারায় গরীব বেদুঈনদের আবাসভূমি। যারা যুদ্ধ-বিগ্রহে পটু ছিল।
কুরায়েশ বংশ কিনানাহর দিকে সম্পর্কিত। যারা মক্কার অনতিদূরে বসবাস করত। এভাবে এখানকার অধিবাসীরা পরস্পরে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকায় মক্কা একটি সুরক্ষিত দুর্গের শহরে পরিণত হয়। সেকারণ মক্কায় আগত কাফেলা সমূহ সর্বদা নিরাপদ থাকত।
মক্কার সামাজিক অবস্থা:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমভাগে কুছাই বিন কিলাব কুরায়েশ গোত্রনেতাদের জমা করে সমাজ ব্যবস্থাপনার একটা ভিত্তি দান করেন। অতঃপর হারামের আশ-পাশের গাছ-গাছালি কেটে সেখানে পাথর দিয়ে বাড়ী-ঘর তৈরীর সূচনা করেন। যা মক্কাকে একটি নগরীর রূপ দান করে। ইতিপূর্বে এখানকার বৃক্ষ সমূহকে অতি পবিত্র মনে করা হ’ত এবং তা কখনোই কাটা হ’ত না। কুছাই ছিলেন প্রথম নেতা, যিনি এখানকার বৃক্ষ কর্তন শুরু করেন। অতঃপর তিনি তার সন্তানদের নগরীর ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন দায়িত্ব প্রদান করেন। যেমন হিজাবাহ (الْحِجَابَةُ) অর্থ কা‘বা গৃহের তত্ত্বাবধান। সিক্বায়াহ (السِّقَايَةُ) অর্থ হাজীদের জন্য পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন। রিফাদাহ (الرِّفَادَةُ) অর্থ হাজীদের আপ্যায়ন ও মেহমানদারী। এজন্য সকল গোত্রের নিকট থেকে নির্দিষ্টহারে চাঁদা নেওয়া হ’ত। যা দিয়ে অভাবগ্রস্ত হাজীদের আপ্যায়ন করা হ’ত। লেওয়া (اللِّوَاءُ) অর্থ যুদ্ধের পতাকা বহন করা। নাদওয়া (النَّدْوَةُ) অর্থ পরামর্শ সভা। যেখানে বসে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সমাজের সমস্যাবলীর সুষ্ঠু সমাধান করা হ’ত এবং সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা হ’ত। কুছাই নিজেই এর দায়িত্বে ছিলেন এবং তিনি এর দরজাটি কা‘বামুখী করেন। বস্ত্ততঃপক্ষে দারুন নাদওয়া ছিল মক্কা নগররাষ্ট্রের পার্লামেন্ট স্বরূপ। কুছাই বিন কিলাব ছিলেন যার প্রেসিডেন্ট এবং প্রত্যেক গোত্রনেতা ছিলেন যার মন্ত্রীসভার সদস্য। বহিরাগত যেসব ব্যবসায়ী মক্কায় ব্যবসার জন্য আসতেন, কুছাই তাদের কাছ থেকে দশ শতাংশ হারে চাঁদা নির্ধারণ করেন। যা মক্কা নগরীর সমৃদ্ধির অন্যতম উৎসে পরিণত হয়। এভাবে কুছাই মক্কা নগরীকে একটি সুসংবদ্ধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করেন। পরবর্তীতেও যা অব্যাহত ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আবির্ভাবকালে মক্কার নেতা ছিলেন তাঁর দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব বিন হাশেম এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ছিলেন চাচা আবু ত্বালেব।
যমযম কূয়া ও মক্কার নেতৃত্ব :::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মক্কার প্রধান আকর্ষণ হ’ল যমযম কূয়া ও কা‘বাগৃহ। দু’টিই আল্লাহর অপূর্ব কুদরতের জ্বলন্ত নিদর্শন। যমযম ও কা‘বাগৃহের সেবা ও তত্ত্বাবধান কার্যের মধ্যে যেমন তাদের উচ্চ মর্যাদা নিহিত ছিল, তেমনি উক্ত মর্যাদা লাভের প্রতিযোগিতাই ছিল তাদের মধ্যকার পারস্পরিক রেষারেষি ও হানাহানির অন্যতম প্রধান কারণ।
তৃষিত হাজেরা ও তার দুগ্ধপোষ্য সন্তান ইসমাঈলের স্বার্থে আল্লাহর হুকুমে সেখানে যমযম কূয়ার সৃষ্টি হয় (বুখারী হা/৩৩৬৪) পরবর্তীতে এই পানিকে কেন্দ্র করেই ইয়ামন থেকে আগত ব্যবসায়ী কাফেলা বনু জুরহুমের মাধ্যমে মক্কায় জনবসতি গড়ে উঠে। এরপর ইবরাহীম ও ইসমাঈলের মাধ্যমে আল্লাহর হুকুমে সেখানে কা‘বাগৃহ নির্মিত হয় (বাক্বারাহ ২/১২৫) ইসমাঈল তাদের মধ্যে বিবাহ করেন। অতঃপর তাঁর সন্তানেরা বংশ পরম্পরায় যমযম ও কা‘বার মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে আসীন ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বনু জুরহুম সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং কিছু হারামকে হালাল করে। তারা বহিরাগতদের উপর যুলুম করে। এমনকি কা‘বার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত উপঢৌকনাদি ভক্ষণ করে। ফলে আল্লাহ তাদের হাত থেকে দায়িত্ব ছিনিয়ে নেন এবং বনু বকর বিন ‘আব্দে মানাত (عبد مناة) বিন কিনানাহ ও গুবশান বিন খোযা‘আহর মাধ্যমে তাদেরকে হটিয়ে দেন। বনু জুরহুম মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে ইয়ামনে ফিরে যাওয়ার সময় যমযম কূয়া বন্ধ করে দিয়ে যায়। পরবর্তীতে বনু বকরকে হটিয়ে বনু খোয়া‘আহ মক্কার একক ক্ষমতায় আসে এবং তারা কয়েক যুগ ধরে উক্ত মর্যাদায় আসীন থাকে। এ সময় কুরায়েশ বংশ বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত ছিল। পরে তারা কুছাই বিন কিলাবের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং মক্কার ক্ষমতায় আসে। কুছাই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পরদাদা হাশেমের দাদা। কুছাই খোযা‘আহ গোত্রের শেষ নেতা হুলাইল বিন হুবশিইয়াহ (حُلَيْلُ بْنُ حُبْشِيَّةَ)-এর কন্যা হুববা (حُبَّى)-কে বিবাহ করেন বিধায় তারা পরবর্তীতে সর্বদা বনু হাশেমের মিত্র ছিল এবং তারা রাসূল (ছাঃ)-কে তাদের ‘ভাগিনার সন্তান’ বলত। তাছাড়া বনু খোযা‘আহ ধারণা করত যে, তাদের নেতা হুলাইল তার জামাতা কুছাইকে পরবর্তী নেতা হিসাবে অছিয়ত করে গেছেন (ইবনু হিশাম ১/১১৩-১৮) এভাবে মক্কার নেতৃত্বে ছিলেন প্রথমে বনু জুরহুম। অতঃপর বনু খুযা‘আহ। অতঃপর বনু কুরায়েশ। রাসূল (ছাঃ)-এর আবির্ভাবকালে কুরায়েশ বংশ মক্কার নেতৃত্বে ছিল। অনুমান করা হয়ে থাকে যে, বনু জুরহুম ২১০০ বছর, বনু খুযা‘আহ ৩০০ বছর মক্কা শাসন করেন। তাদের পর থেকে কুরায়েশ বংশ মক্কা শাসন করে (আর-রাহীক্ব ২৮-২৯)।
পক্ষান্তরে বনু খোযা‘আহর হাতে ইতিপূর্বে বিতাড়িত বনু বকর সর্বদা রাসূল (ছাঃ)-এর বিরোধী জোটের মিত্র ছিল। সেকারণ পরবর্তীতে বনু খোযা‘আহর উপর বনু বকরের হামলা ও হত্যাকান্ডের ফলেই হোদায়বিয়ার সন্ধি ভেঙ্গে যায় এবং মক্কা বিজয় ত্বরান্বিত হয়। কুরায়েশ বংশ ছিল বনু ইসমাঈলের শ্রেষ্ঠ শাখা এবং কুরায়েশ বংশের শ্রেষ্ঠ শাখা ছিল বনু হাশেম গোত্র।
আব্দুল মুত্ত্বালিবের স্বপ্ন ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
কুছাইয়ের পর পর্যায়ক্রমে যখন রাসূল (ছাঃ)-এর দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব মক্কার নেতা হন। তিনি পরপর চার রাত্রি স্বপ্নে দেখেন যে, এক ব্যক্তি এসে তাঁকে কূয়া খনন করতে বলছে। চতুর্থ রাত্রিতে তাঁকে কূয়ার নাম ‘যমযম’ ও তার স্থান নির্দেশ করে দেওয়া হয়। তখন আব্দুল মুত্ত্বালিব তাঁর একমাত্র পুত্র হারেছকে সাথে নিয়ে স্থানটি খনন করেন। এ সময় তার অন্যকোন পুত্র সন্তান জন্মলাভ করেনি। কুরায়েশদের সকল গোত্র এই মহান কাজে তাঁর সাথে শরীক হ’তে চায়। তারা বলে যে, এটি পিতা ইসমাঈল-এর কূয়া। অতএব এতে আমাদের সবার অধিকার আছে। আব্দুল মুত্ত্বালিব বললেন, স্বপ্নে এটি কেবল আমাকেই খাছভাবে করতে বলা হয়েছে। অতএব আমি তোমাদের দাবী মেনে নিতে পারি না’ তখন ঝগড়া মিটানোর জন্য তারা এক গণৎকার মহিলার কাছে বিচার দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু হেজায ও শামের মধ্যবর্তী উক্ত দূরবর্তী স্থানে পৌঁছার আগেই যখন গোত্রনেতারা পানির সংকটে পড়ে যায় এবং তৃষ্ণায় মৃত্যুর আশংকায় পতিত হয়ে নিজেরা নিজেদের কবর খুঁড়তে শুরু করে, তখন আল্লাহর রহমতে আব্দুল মুত্ত্বালিবের উটের পায়ের তলার মাটি দিয়ে মিষ্ট পানি উথলে ওঠে। যা কওমের সকলে পান করে বেঁচে যায়। এতে তারা কূয়ার উপরে আব্দুল মুত্ত্বালিবের মালিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায় এবং তারা সকলে মিলে তার নিকটেই এটি সোপর্দ করে। ঘটনাটি খুবই প্রসিদ্ধ ছিল যা হযরত আলী (রাঃ) হ’তে ‘হাসান’ সনদে ইবনু ইসহাক বর্ণনা করেছেন।
এভাবে পানির মালিকানার সাথে সাথে বনু হাশিমের উচ্চ মর্যাদা ও নেতৃত্ব সকলের অন্তরে দৃঢ় আসন লাভ করে। তারা সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং গণৎকার মহিলার কাছে না গিয়েই ফিরে আসেন। যমযম কূপের মালিকানা নিয়ে আর কখনোই ঝগড়া করবেন না বলে তারা প্রতিজ্ঞা করেন। এরপর থেকে হাজীদের পানি পান করানো (সিক্বায়াহ) ও তাদের খাওয়ানো সহ আপ্যায়ন (রিফাদাহ) করার মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব স্থায়ীভাবে বনু হাশেম-এর উপর ন্যস্ত হয়। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে কুরায়েশগণ কা‘বা থেকে দূরে বিভিন্ন কূপ খনন করে পানির চাহিদা মিটাতেন (ইবনু হিশাম ১/১৪২-৪৭)।
বনু জুরহুম মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় যমযম কূয়ায় দু’টি সোনার হরিণ, বর্ম, তরবারি ইত্যাদি ফেলে যায়। অতঃপর উক্ত তরবারি উঠিয়ে আব্দুল মুত্ত্বালিব কা‘বাগৃহের দরজা ঢালাই করেন এবং হরিণ দু’টিকে দরজার সামনে রেখে দেন বলে যে সব কথা চালু আছে, তা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়।
মক্কার ধর্মীয় অবস্থা ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
কা‘বাগৃহের কারণে মক্কা ছিল সমগ্র আরব ভূখন্ডের ধর্মীয় কেন্দ্রবিন্দু এবং সম্মান ও মর্যাদায় শীর্ষস্থানীয়। সেকারণ খ্রিষ্টান রাজারা এর উপরে দখল কায়েম করার জন্য বারবার চেষ্টা করত। এক সময় ইয়ামনের খ্রিষ্টান নরপতি আবরাহা নিজ রাজধানী ছান‘আতে স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে কা‘বাগৃহের আদলে একটি সুন্দর গৃহ নির্মাণ করেন এবং সবাইকে সেখানে হজ্জ করার নির্দেশ জারী করেন। কিন্তু জনগণ তাতে সাড়া দেয়নি। বরং কে একজন গিয়ে তার ঐ নকল কা‘বাগৃহে (?) পায়খানা করে আসে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি প্রায় ৬০ হাযার সৈন্য ও হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কায় অভিযান করেন কা‘বাগৃহকে ধ্বংস করার জন্য। অবশেষে আল্লাহর গযবে তিনি নিজে তার সৈন্য-সামন্ত সহ ধ্বংস হয়ে যান। এতে মক্কার সম্মান ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায় এবং এ ঘটনা বণিকদের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্মের মাত্র ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে এই অলৌকিক ঘটনা ঘটে। বস্ত্ততঃ এটা ছিল শেষনবীর আগমনের আগাম শুভ সংকেত (الْإِرْهَاصُ) মাত্র। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, উক্ত ঘটনার পরে মক্কাবাসীগণ দশ বছর যাবৎ পূর্ণ তাওহীদবাদী ছিল এবং মূর্তিপূজার শিরক পরিত্যাগ করেছিল’।
সমগ্র আরব উপদ্বীপে মক্কা ছিল বৃহত্তম নগরী এবং মক্কার অধিবাসী ও ব্যবসায়ীদের মর্যাদা ছিল সবার উপরে। হারাম শরীফের উচ্চ মর্যাদার কারণে তাদের মর্যাদা আপামর জনগণের মধ্যে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, চোর-ডাকাতেরাও তাদেরকে সমীহ করত।
এটাই যেখানে বাস্তবতা, সেখানে এই যুগটিকে ‘জাহেলী যুগ’ (الْأَيَّامُ الْجَاهِلِيَّةُ) কেন বলা হয়? এর কারণ সম্ভবতঃ এটাই ছিল যে, তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসারী এবং তাওহীদপন্থী হওয়া সত্ত্বেও শিরকে লিপ্ত হয়েছিল। তারা আল্লাহর বিধান সমূহকে অগ্রাহ্য করেছিল এবং খোদ আল্লাহর ঘরেই মূর্তিপূজার মত নিকৃষ্টতম শিরকের প্রবর্তন করেছিল। তারা শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে চিনতে পেরেও তাঁকে অস্বীকার করেছিল। নিঃসন্দেহে এটা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় জাহেলিয়াত ও সবচেয়ে বড় মূর্খতা। আর একারণেই ‘জ্ঞানের পিতা’ আবুল হাকাম-কে ‘মূর্খতার পিতা’ আবু জাহল লকব দেওয়া হ’ল।[2] বস্ত্ততঃ ইসলামের বিরোধী যা কিছু, সবই জাহেলিয়াত। আল্লাহ বলেন,أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ- ‘তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিচার-ফায়ছালা কামনা করে? অথচ দৃঢ় বিশ্বাসীদের নিকট আল্লাহর চাইতে উত্তম ফায়ছালাকারী আর কে আছে?’ (মায়েদাহ ৫/৫০) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَاءِ جَهَنَّمَ ‘যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের দিকে মানুষকে আহবান করে, সে ব্যক্তি জাহান্নামীদের দলভুক্ত’।[3] উল্লেখ্য যে, জাহেলী আরবী সাহিত্যের ইতিহাস ইসলাম আগমনের পূর্বে দেড়শ’ বছরের বেশী নয় (সীরাহ ছহীহাহ ১/৭৯)। এক্ষণে আমরা মক্কায় জাহেলিয়াত প্রসারের ইতিবৃত্ত সংক্ষেপে বর্ণনা করব।
শিরকের প্রচলন:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মক্কার বাসিন্দারা মূলতঃ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর ছিল এবং তারা জন্মগতভাবেই তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতে বিশ্বাসী ছিল। তারা কা‘বাগৃহকে যথার্থভাবেই আল্লাহর গৃহ বা বায়তুল্লাহ বলে বিশ্বাস করত এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করত। তারা এখানে নিয়মিতভাবে ত্বাওয়াফ, সাঈ তথা হজ্জ ও ওমরাহ করত এবং বহিরাগত হাজীদের নিরাপত্তা ও পানি সরবরাহের দায়িত্ব পালন করত। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ কোন নবী না আসায় শয়তানী প্ররোচনায় তাদের সমাজনেতা ও ধনিক শ্রেণীর অনেকে পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং এক সময় তাদের মাধ্যমেই মূর্তিপূজার শিরকের প্রচলন হয়, যেভাবে ইতিপূর্বে নূহ (আঃ)-এর কওমের মধ্যে হয়েছিল।
(১) কুরায়েশ বংশের বনু খোযা‘আহ গোত্রের সরদার ‘আমর বিন লুহাই(عَمرو بن لُحَى بن عامر الْخُزاعى) অত্যন্ত ধার্মিক, দানশীল ও দরবেশ স্বভাবের লোক ছিলেন। লোকেরা তাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত এবং তার প্রতি অন্ধভক্তি পোষণ করত। তাকে আরবের শ্রেষ্ঠ আলেম ও অলি-আউলিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হ’ত। অতএব শয়তান তাকেই বেছে নিল তার কার্যসিদ্ধির জন্য। একবার তিনি শামের ‘বালক্বা’ (الْبَلْقَاء) অঞ্চলের ‘মাআব’ (مَآب) নগরীতে গিয়ে দেখেন যে, সেখানকার লোকেরা জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে ‘হুবাল’ (هُبَل) মূর্তির পূজা করে। তিনি তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে যে, আমরা এই মূর্তির অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করলে বৃষ্টি হয় এবং সাহায্য প্রার্থনা করলে সাহায্য পাই’ এরা ছিল আমালেক্বা গোত্রের লোক এবং ইমলীক্ব বিন লাবেয বিন সাম বিন নূহ-এর বংশধর।আমর ভাবলেন অসংখ্য নবী-রাসূলের জন্মভূমি ও কর্মভূমি এই শামের ধার্মিক লোকেরা যখন ‘হোবল’ মূর্তির অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করে, তখন আমরাও এটা করলে উপকৃত হব। ফলে বহু মূল্যের বিনিময়ে আমর একটা হোবল মূর্তি খরীদ করে নিয়ে গেলেন এবং মক্কার নেতাদের রাযী করিয়ে কা‘বাগৃহে স্থাপন করলেন। কথিত আছে যে, একটা জিন আমরের অনুগত ছিল। সেই-ই তাকে খবর দেয় যে, নূহ (আঃ)-এর সময়কার বিখ্যাত অদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক্ব, নাসর (নূহ ৭১/২৩) প্রতিমাগুলি জেদ্দার অমুক স্থানে মাটির নীচে প্রোথিত আছে। আমর সেখানে গিয়ে সেগুলো উঠিয়ে এনে তেহামায় রেখে দিলেন। অতঃপর হজ্জ-এর মওসুমে সেগুলিকে বিভিন্ন গোত্রের হাতে সমর্পণ করলেন। এভাবে আমর ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইসমাঈল (আঃ)-এর দ্বীনে পরিবর্তন আনেন এবং তাওহীদের বদলে শিরকের প্রবর্তন করেন (আর-রাহীক্ব ৩৫ পৃঃ)।
অতঃপর বনু ইসমাঈলের মধ্যে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে। নূহ (আঃ
)-এর কওমের রেখে যাওয়া অদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক্ব, নাস্র (নূহ ৭১/২৩) প্রভৃতি মূর্তিগুলি এখন ইবরাহীমের বংশধরগণের দ্বারা পূজিত হ’তে থাকে। যেমন- বনু হুযায়েল কর্তৃক সুওয়া‘ (سُوَاع), ইয়ামনের বনু জুরাশ কর্তৃক ইয়াগূছ (يَغُوث), বনু খায়ওয়ান কর্তৃক ইয়া‘ঊক্ব (يَعُوق), যুল-কুলা‘ কর্তৃক নাস্র(نَسْر), কুরায়েশ ও বনু কেনানাহ কর্তৃক হুবাল (هُبَل) ও উযযা (العُزَّى), ত্বায়েফের বনু ছাক্বীফ কর্তৃক লাত (اللاَّت), মদীনার আউস ও খাযরাজ কর্তৃক মানাত(مَنَاة), বনু ত্বাঈ কর্তৃক ফিল্স (فِلْسُ), ইয়ামনের হিমইয়ার গোত্র কর্তৃক রিয়াম (رِيَام), দাউস ও খাছ‘আম গোত্র কর্তৃক যুল-কাফফায়েন (ذُو الْكَفَّيْن) ও যুল-খালাছাহ (ذُو الْخَلَصَة) প্রভৃতি মূর্তি সমূহ পূজিত হ’তে থাকে (ইবনু হিশাম ১/৭৭-৮৭)।
এভাবে ক্রমে আরবের ঘরে ঘরে মূর্তিপূজার প্রসার ঘটে। ফলে মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কা‘বাগৃহের ভিতরে ও চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি দেখতে পান। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেন ও কা‘বাগৃহ পানি দিয়ে ধুয়ে ছাফ করে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আমার সম্মুখে (স্বপ্নে) জাহান্নামকে পেশ করা হ’ল, ... অতঃপর আমাকে দেখানো হ’ল ‘আমর বিন ‘আমের আল-খুযাঈকে। জাহান্নামে সে তার নাড়ী-ভুঁড়ি টেনে বেড়াচ্ছে। এ ব্যক্তিই প্রথম তাদের উপাস্যদের নামে উট ছেড়ে দেওয়ার রেওয়াজ চালু করেছিল (যা লোকেরা রোগ আরোগ্যের পর কিংবা সফর থেকে আসার পর তাদের মূর্তির নামে ছেড়ে দিত) ঐসব উট সর্বত্র চরে বেড়াত। কারু ফসল নষ্ট করলেও কিছু বলা যেত না বা তাদের মারা যেত না’।[2]
(২) তারা মূর্তির পাশে বসে তাকে উচ্চকণ্ঠে আহবান করত ও তাদের অভাব মোচনের জন্য অনুনয়-বিনয় করে প্রার্থনা জানাতো। তারা ধারণা করত যে, এই মূর্তি তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করবে (যুমার ৩৯/৩) এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকটে সুফারিশ করবে (ইউনুস ১০/১৮)।
(৩) তারা মূর্তির উদ্দেশ্যে হজ্জ করত, ত্বাওয়াফ করত, তার সামনে নত হ’ত ও সিজদা করত। ত্বাওয়াফের সময় তারা শিরকী তালবিয়াহ পাঠ করত।- لَبَّيْكَلاَ شَرِيكَ لَكَ إِلاَّ شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ ‘হে আল্লাহ! আমি হাযির। তোমার কোন শরীক নেই, কেবল ঐ শরীক যা তোমার জন্য রয়েছে। তুমি যার মালিক এবং সে যা কিছুর মালিক) মুশরিকরা ‘লাববাইকা লা শারীকা লাকা’ বলার পর রাসূল (ছাঃ) তাদের উদ্দেশ্যে ক্বাদ ক্বাদ (থামো থামো) বলতেন।[3] এজন্যেই আল্লাহ বলেছেন, وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلاَّ وَهُمْ مُشْرِكُونَ ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে। অথচ সেই সাথে শিরক করে’ (ইউসুফ ১২/১০৬)। (৪) তারা মূর্তির জন্য নযর-নেয়ায নিয়ে আসত এবং মূর্তির নামে কুরবানী করত (মায়েদাহ ৫/৩)। (৫) তারা মূর্তিকে খুশী করার জন্য গবাদিপশু ও চারণক্ষেত্র মানত করত। যাদেরকে কেউ ব্যবহার করতে পারত না (আন‘আম ৬/১৩৮-১৪০)। (৬) তারা তাদের বিভিন্ন কাজের ভাল-মন্দ ফলাফল ও শুভাশুভ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন প্রকারের তীর ব্যবহার করত (মায়েদাহ ৫/৯০-৯১)যাতে হ্যাঁ, না, ভাল, মন্দ ইত্যাদি লেখা থাকত। হোবল দেবতার খাদেম সেগুলো একটি পাত্রের মধ্যে ফেলে তাতে ঝাঁকুনি দিয়ে তীরগুলি ঘুলিয়ে ফেলত। অতঃপর যে তীরটা বেরিয়ে আসত, সেটাকেই তারা ভাগ্য মনে করত এবং সে অনুযায়ী কাজ করত। (৭) এতদ্ব্যতীত তারা জ্যোতিষীদের কথা বিশ্বাস করত এবং বিশেষ বিশেষ নক্ষত্রকে মঙ্গলামঙ্গলের কারণ মনে করত।[4] (৮) তারা পাখি উড়িয়ে দিয়ে বা রেখা টেনে কাজের শুভাশুভ ও ভাল-মন্দ নির্ধারণ করত এবং পাখি ডাইনে গেলে শুভ ও বামে গেলে অশুভ ধারণা করত।[5] তারা ফেরেশতাদেরকে ‘আল্লাহর কন্যা’ বলত এবং জিনদের সাথে আল্লাহর আত্মীয়তা সাব্যস্ত করত (ছাফফাত ৩৭/১৫০-৫২, ১৫৮-৫৯)তারা নিজেদের জন্য পুত্রসন্তান ও আল্লাহর জন্য কন্যাসন্তান নির্ধারণ করত
ইহূদী-নাছারাদের অবস্থা ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, ইয়াছরিবের অধিবাসী আউস ও খাযরাজগণ ইসমাঈল-পুত্র নাবেত-এর বংশধর ছিলেন। কিন্তু তারা পরে মূর্তিপূজারী হয়ে যায়। সিরিয়া ও ইরাকের পথে ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং মিষ্ট পানি ও উর্বর অঞ্চল বিবেচনায় ইহূদীরা এখানে আগেই আগমন করে। তারা অত্যাচারী রাজা বুখতানছর কর্তৃক কেন‘আন (ফিলিস্তীন) থেকে উৎখাত হওয়ার পরে ইয়াছরিবে এসে বসবাস শুরু করেছিল এই উদ্দেশ্যে যে, তারা বায়তুল মুক্বাদ্দাস হারিয়েছে। অতএব তারা এখন বায়তুল্লাহর নিকটবর্তী থাকবে এবং নিয়মিত হজ্জ-ওমরাহর মাধ্যমে পরকালীন পাথেয় হাছিল করবে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আখেরী নবীর আবির্ভাব যেহেতু মক্কায় হবে এবং তাঁর আবির্ভাবের সময় আসন্ন, অতএব তারা দ্রুত তাঁর দ্বীন কবুল করবে এবং তাঁর নেতৃত্বে আবার বায়তুল মুক্বাদ্দাস দখল করবে। তবে তাদের ধারণা ছিল যে, আখেরী নবী অবশ্যই তাদের নবী ইসহাক-এর বংশে হবেন। কিন্তু তা না হ’য়ে ইসমাঈল-এর বংশে হওয়াতেই ঘটল যত বিপত্তি।
মদীনায় ইহূদীদের আধিক্য ছিল এবং নাছারা ছিল খুবই কম। তাদের মূল অবস্থান ছিল মদীনা থেকে নাজরান এলাকায়। যা ছিল ৭৩টি পল্লী সমৃদ্ধ খ্রিষ্টানদের একটি বিরাট নগরীর নাম। বর্তমানে সড়কপথে এটি মদীনা থেকে ১২০৫ কি.মি. দক্ষিণে ইয়ামন সীমান্তে অবস্থিত।
ইহূদী ও নাছারাদের মধ্যে তাওরাত-ইনজীলের কোন শিক্ষা অবশিষ্ট ছিল না। তাদের ধর্ম ও সমাজনেতারা (الْأَحْبَارُ وَالرُّهْبَانُ) ভক্তদের কাছে ‘রব’-এর আসন দখল করেছিল। ইহূদীরা ওযায়েরকে ‘আল্লাহর বেটা’ বানিয়েছিল এবং নাছারারা মসীহ ঈসাকে একইভাবে ‘বেটা’ দাবী করেছিল (তওবাহ ৯/৩০-৩১) বরং তারা মারিয়াম, ঈসা ও আল্লাহকে নিয়ে তিন উপাস্যের সমন্বয়ে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিল (মায়েদাহ ৫/৭৩)। তাদের পীর-দরবেশরা ধর্মের নামে বাতিল পন্থায় মানুষের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করত এবং তাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতো (তওবাহ ৯/৩৪)আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তারা তা হারাম করত না (তওবাহ ৯/২৯) এক কথায় তাওরাত-ইনজীলের বাহক হবার দাবীদার হ’লেও তারা ছিল পুরা স্বেচ্ছাচারী ও প্রবৃত্তিপূজারী দুনিয়াদার। ঠিক আজকের মুসলিম ধর্মনেতা ও সমাজনেতাদের অধিকাংশের অবস্থা যেমনটি হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মাক্কী জীবন - শৈশব থেকে নবুঅত :::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
নবী জীবনকে আমরা প্রধান দু’টি ভাগে ভাগ করে নেব- মাক্কী জীবন ও মাদানী জীবন। মক্কায় তাঁর জন্ম, বৃদ্ধি ও নবুঅত লাভ এবং মদীনায় তাঁর হিজরত, ইসলামের বাস্তবায়ন ও ওফাত লাভ।
আরবের মরুদুলাল শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হেজাযের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন ও সেখানে জীবনের ৫৩টি বছর কাটান। যার মধ্যে ১৩ বছর ছিল নবুঅতী জীবন। অতঃপর তিনি মদীনায় হিজরত করেন ও সেখানে জীবনের বাকী ১০ বছর কাটান। অতঃপর সেখানেই ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।[1] এক্ষণে আমরা তাঁর বংশ পরিচয় ও জীবন বৃত্তান্ত পেশ করব।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নাম সমূহ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
জুবাইর বিন মুত্ব‘ইম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِنَّ لِى أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِى الَّذِى يَمْحُو اللهُ بِىَ الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِى يُحْشَرُ النَّاسُعَلَى قَدَمَىَّ وَأَنَا الْعَاقِبُ الَّذِى لَيْسَ بَعْدَهُ أَحَدٌ- ‘আমার অনেকগুলি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ (প্রশংসিত), আমি আহমাদ (সর্বাধিক প্রশংসিত), আমি ‘মাহী’ (বিদূরিতকারী) আমার মাধ্যমে আল্লাহ কুফরীকে বিদূরিত করেছেন। আমি ‘হাশের’ (জমাকারী)কেননা সমস্ত লোক ক্বিয়ামতের দিন আমার কাছে জমা হবে (এবং শাফা‘আতের জন্য অনুরোধ করবে)। আমি ‘আক্বেব’ (সর্বশেষে আগমনকারী)। আমার পরে আর কোন নবী নেই’।[1] সুলায়মান মানছূরপুরী বলেন, উক্ত নাম সমূহের মধ্যে মুহাম্মাদ ও আহমাদ হ’ল তাঁর মূল নাম এবং বাকীগুলো হ’ল তাঁর গুণবাচক নাম। সেজন্য তিনি সেগুলির ব্যাখ্যা করেছেন। এই গুণবাচক নামের সংখ্যা মানছূরপুরী গণনা করেছেন ৫৪টি। তিনি ৯২টি করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
‘মুহাম্মাদ’ নামের প্রশংসায় চাচা আবু তালিব বলতেন,
وَشَقَّ لَهُ مِنَ اسْمِهِ لِيُجِلَّهُ + فَذُو الْعَرْشِ مَحْمُودٌ وَهَذَا مُحَمَّدُ
‘তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ নিজের নাম থেকে তার নাম বের করে এনেছেন। তাই আরশের মালিক হ’লেন মাহমূদ এবং ইনি হ’লেন মুহাম্মাদ’।
জুবাইর বিন মুত্ব‘ইম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِنَّ لِى أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِى الَّذِى يَمْحُو اللهُ بِىَ الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِى يُحْشَرُ النَّاسُعَلَى قَدَمَىَّ وَأَنَا الْعَاقِبُ الَّذِى لَيْسَ بَعْدَهُ أَحَدٌ- ‘আমার অনেকগুলি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ (প্রশংসিত), আমি আহমাদ (সর্বাধিক প্রশংসিত), আমি ‘মাহী’ (বিদূরিতকারী) আমার মাধ্যমে আল্লাহ কুফরীকে বিদূরিত করেছেন। আমি ‘হাশের’ (জমাকারী)কেননা সমস্ত লোক ক্বিয়ামতের দিন আমার কাছে জমা হবে (এবং শাফা‘আতের জন্য অনুরোধ করবে)। আমি ‘আক্বেব’ (সর্বশেষে আগমনকারী)। আমার পরে আর কোন নবী নেই’।[1] সুলায়মান মানছূরপুরী বলেন, উক্ত নাম সমূহের মধ্যে মুহাম্মাদ ও আহমাদ হ’ল তাঁর মূল নাম এবং বাকীগুলো হ’ল তাঁর গুণবাচক নাম। সেজন্য তিনি সেগুলির ব্যাখ্যা করেছেন। এই গুণবাচক নামের সংখ্যা মানছূরপুরী গণনা করেছেন ৫৪টি। তিনি ৯২টি করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
‘মুহাম্মাদ’ নামের প্রশংসায় চাচা আবু তালিব বলতেন,
وَشَقَّ لَهُ مِنَ اسْمِهِ لِيُجِلَّهُ + فَذُو الْعَرْشِ مَحْمُودٌ وَهَذَا مُحَمَّدُ
‘তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ নিজের নাম থেকে তার নাম বের করে এনেছেন। তাই আরশের মালিক হ’লেন মাহমূদ এবং ইনি হ’লেন মুহাম্মাদ’।
লালন-পালন:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
জন্মের পর শিশু মুহাম্মাদ কিছুদিন চাচা আবু লাহাবের দাসী ছুওয়াইবার দুধ পান করেন। তাঁর পূর্বে চাচা হামযা বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব এবং তাঁর পরে আবু সালামাহ তার দুধ পান করেন।[1] ফলে তাঁরা সকলে পরস্পরে দুধভাই ছিলেন।
এ সময় পিতা আব্দুল্লাহ্র রেখে যাওয়া একমাত্র মুক্তদাসী উম্মে আয়মন রাসূল (ছাঃ)-কে শৈশবে লালন-পালন করেন। এরপর ধাত্রী হালীমা সা‘দিয়াহ তাঁকে প্রতিপালন করেন। অতঃপর হালীমার গৃহ থেকে আসার পর মা আমেনা তাকে সাথে নিয়ে মদীনায় স্বামীর কবর যিয়ারত করতে যান এবং ফেরার পথে মৃত্যুবরণ করলে কিশোরী উম্মে আয়মন শিশু মুহাম্মাদকে সাথে নিয়ে মক্কায় ফেরেন। পরে খাদীজা (রাঃ)-এর মুক্তদাস যায়েদ বিন হারেছাহ্র সাথে তার বিয়ে হয়। অতঃপর তার গর্ভে উসামা বিন যায়েদের জন্ম হয়। রাসূল (ছাঃ) উম্মে আয়মানকে ‘মা’ (يَا أُمَّهْ) বলে সম্বোধন করতেন এবং নিজ পরিবারভুক্ত (بَقِيَّةُ أَهْلِ بَيْتِي) বলতেন। তিনি তাকে ‘মায়ের পরে মা’ (أُمِّي بَعْدَ أُمِّي) বলে সম্মানিত করতেন।[2]
সে সময়ে শহরবাসী আরবদের মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে, শহরের জনাকীর্ণ পংকিল পরিবেশ থেকে দূরে গ্রামের নিরিবিলি উন্মুক্ত পরিবেশে শিশুদের লালন-পালন করলে তারা বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি হ’তে মুক্ত থাকে এবং তাদের স্বাস্থ্য সুঠাম ও সবল হয়। সর্বোপরি তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত হয়। সে হিসাবে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ধাত্রী হিসাবে পরিচিত বনু সা‘দ গোত্রের হালীমা সা‘দিয়াহকে নির্বাচন করেন এবং তার হাতেই প্রাণাধিক পৌত্রকে সমর্পণ করেন। হালীমার গৃহে দু’বছর দুগ্ধপানকালীন সময়ে তাদের পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। তাদের ছাগপালে এবং অন্যান্য সকল বিষয়ে আল্লাহর তরফ থেকে বরকত নেমে আসে। নিয়মানুযায়ী দু’বছর পরে বাচ্চাকে ফেরত দেওয়ার জন্য তাঁকে মা আমেনার কাছে আনা হয়। কিন্তু হালীমা তাকে ছাড়তে চাচ্ছিলেন না। তিনি আমেনাকে বারবার অনুরোধ করেন আরও কিছুদিন বাচ্চাকে তার কাছে রাখার জন্য। ঐ সময় মক্কায় মহামারী দেখা দিয়েছিল। ফলে মা রাযী হয়ে যান এবং বাচ্চাকে পুনরায় হালীমার কাছে অর্পণ করেন
আমেনার ইয়াছরিব গমন ও মৃত্যুবরণ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
প্রাণাধিক সন্তানকে কাছে পেয়ে আমেনা তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর কবর যেয়ারত করার মনস্থ করেন। শ্বশুর আব্দুল মুত্ত্বালিব সব ব্যবস্থা করে দেন। সেমতে পুত্র মুহাম্মাদ ও পরিচারিকা উম্মে আয়মনকে সাথে নিয়ে তিনি মক্কা থেকে প্রায় ৪৬০ কিঃ মিঃ উত্তরে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। অতঃপর যথাসময়ে মদীনায় পৌঁছে নাবেগা আল-জা‘দীর পারিবারিক গোরস্থানে স্বামীর কবর যেয়ারত করেন। অতঃপর সেখানে এক মাস বিশ্রাম নেন। এরপর পুনরায় মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিন্তু কিছু দূর এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ‘আবওয়া’ (الأَبْوَاء) নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। যা বর্তমানে মদীনা থেকে মক্কার পথে ২৫০ কিঃ মিঃ দূরে অবস্থিত একটি শহরের নাম। উম্মে আয়মন শিশু মুহাম্মাদকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এভাবে জন্ম থেকে পিতৃহারা ইয়াতীম মুহাম্মাদ মাত্র ৬ বছর বয়সে মাতৃহারা হ’লেন
দাদার স্নেহনীড়ে মুহাম্মাদ ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
পিতৃ-মাতৃহীন ইয়াতীম মুহাম্মাদ এবার এলেন প্রায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিবের স্নেহনীড়ে। আব্দুল মুত্ত্বালিব নিজেও ছিলেন জন্ম থেকে ইয়াতীম। সেই শিশুকালের ইয়াতীম আব্দুল মুত্ত্বালিব আজ বৃদ্ধ বয়সে নিজ ইয়াতীম পৌত্রের অভিভাবক হন। কিন্তু এ স্নেহনীড় বেশী দিন স্থায়ী হয়নি।
মাত্র দু’বছর পরে শিশু মুহাম্মাদের বয়স যখন ৮ বছর, তখন তার দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব ৮২ বছর বয়সে মক্কায় ইন্তেকাল করেন। ফলে তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী আপন চাচা আবু ত্বালিব তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ তিনি ভাতীজার যোগ্য অভিভাবক হিসাবে জীবনপাত করেন।
শিশু মুহাম্মাদের কিছু বরকতমন্ডিত নিদর্শন:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
(১) ধাত্রীমাতা হালীমা সা‘দিয়াহ বলেন, ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। বাহন মাদী গাধাটির অবস্থাও ছিল করুণ। কেননা এ সময় আরব ভূমিতে দুর্ভিক্ষের বছর চলছিল। ফলে বেশী অর্থ পাবে না বলে ইয়াতীম মুহাম্মাদকে কেউ নিতে চাচ্ছিল না। অবশেষে আমি তাকে নিতে সম্মত হ’লাম। অতঃপর যখন তাকে বুকে রাখলাম, তখন সে এবং আমার গর্ভজাত সন্তান দু’জনে পেট ভরে আমার বুকের দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। ওদিকে উটনীর পালান দুধে ভরে উঠল। যার দুধ আমরা সবাই তৃপ্তির সাথে পান করলাম। তখন আমার স্বামী হারেছ বললেন, ‘হালীমা! আল্লাহর কসম! তুমি এক মহা ভাগ্যবান সন্তান লাভ করেছ’। তারপর বাড়ীতে ফিরে আসার সময় দেখা গেল যে, আমাদের সেই দুর্বল মাদী গাধাটি এত তেযী হয়ে গেছে যে, কাফেলার সবাইকে পিছনে ফেলে সে এগিয়ে যাচ্ছে। যা দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গেল।
(২) বাড়ীতে ফিরে এসে দেখা গেল আমাদের রাখাল যে চারণভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেত অন্যান্য রাখালরাও সেখানে তাদের পশুপাল নিয়ে যেত। কিন্তু তাদের পশুগুলো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরত। অথচ আমাদের পশুপাল তৃপ্ত অবস্থায় এবং পালানে দুধভর্তি অবস্থায় বাড়ী ফিরত। এভাবে আমরা প্রতিটি ব্যাপারেই বরকত লক্ষ্য করলাম এবং আমাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এল।[1]
(৩) কা‘বা চত্বরের যে নির্দিষ্ট স্থানটিতে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব বসতেন, সেখানে তার জন্য নির্দিষ্ট আসনে কেউ বসতো না। কিন্তু শিশু মুহাম্মাদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি এসে সরাসরি দাদার আসনেই বসে পড়তেন। তার চাচারা তাকে সেখান থেকে নামিয়ে দিতে চাইলে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব তাকে নিজের কাছেই বসাতেন ও গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলতেন, دَعُوا ابْنِي فَوَاللهِ إنَّ لَهُ لَشَأْنًا ‘আমার এ বেটাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম এর মধ্যে বিশেষ কিছু শুভ লক্ষণ আছে’।
উল্লেখ্য যে, ভাতীজার প্রশংসায় পঠিত আবু তালিবের কবিতা,
وَأَبْيَضَ يُسْتَسْقَى الْغَمَامُ بِوَجْهِهِ + ثِمَالَ الْيَتَامَى عِصْمَةً لِلأَرَامِلِ
‘শুভ্র দর্শন (মুহাম্মাদ) যার চেহারার অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। সে যে ইয়াতীমদের আশ্রয়স্থল ও বিধবাদের রক্ষক’ যা তিনি পাঠ করেছিলেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুঅত লাভের পর কুরাইশদের চরম হুমকির সময়। এর মাধ্যমে তিনি মক্কার নেতাদেরকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন এবং বলতে চেয়েছিলেন যে, কোন অবস্থাতেই তিনি মুহাম্মাদকে তাদের দাবী মতে তাদের হাতে ছেড়ে দিবেন না। ইবনু হিশাম বলেন, উক্ত প্রসঙ্গে আবু তালিব ৮০ লাইনের যে দীর্ঘ কবিতা পাঠ করেন, তা আমার নিকটে বিশুদ্ধভাবে এসেছে। তবে কোন কোন বিদ্বান এর অধিকাংশ কবিতা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন’ (ইবনু হিশাম ১/২৭২-৮০)।
এক্ষণে শিশুকালে তাঁকে নিয়ে চাচা কা‘বাগৃহে গিয়ে তাঁর অসীলায় এই দো‘আ করেছিলেন বলে ত্বাবাক্বাতে ইবনে সা‘দ, বায়হাক্বী দালায়েলুন নবুঅত প্রভৃতি গ্রন্থে যে বর্ণনা এসেছে তার সনদ ‘যঈফ’ (মা শা-‘আ ১৪-১৫ পৃঃ)। বরং মদীনাতে গিয়ে অনাবৃষ্টির সময় লোকদের দাবীর প্রেক্ষিতে জুম‘আর খুৎবায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে রাসূল (ছাঃ) বৃষ্টি প্রার্থনা করেছেন এবং সে বৃষ্টিতে মদীনা সিক্ত হয়েছে।[3] রাসূল (ছাঃ)-এর বৃষ্টি প্রার্থনার সময় আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) আবু ত্বালিবের পঠিত উপরোক্ত কবিতার লাইনটি পাঠ করতেন’।[4] ইবনু কাছীর (রহঃ) আবু ত্বালিবের পঠিত দীর্ঘ কবিতাকে বহুবিশ্রুত সাব‘আ মু‘আল্লাক্বার কবিতাসমূহের চাইতে অধিক উত্তম ও সারগর্ভ বলে মত প্রকাশ করেছেন’।[5] জনৈক বেদুঈন ব্যক্তির আবেদনক্রমে রাসূল (ছাঃ) মিম্বরে উঠে আল্লাহর নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করে বলেন, اللَّهُمَّ اسْقِنَا ‘হে আল্লাহ! আমাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণ কর’উক্ত হাদীছে এ কথাও রয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَوْ كَانَ أَبُو طَالِبٍ حَيًّا لَقَرَّتْ عَيْنَاهُ ‘যদি আজ আবু ত্বালিব বেঁচে থাকতেন, তাহ’লে তার দু’চক্ষু শীতল হয়ে যেত’ অতঃপর তিনি বলেন, কে আমাদেরকে তাঁর সেই কথাগুলি শুনাবে? তখন আলী (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সম্ভবতঃ আপনি তাঁর কবিতার সেই কথা বলছেন। যেখানে তিনি বলেছেন, وَأَبْيَضَ يُسْتَسْقَى الْغَمَامُ بِوَجْهِهِ (বায়হাক্বী, দালায়েল হা/২৩৮)ইবনু হাজার বলেন, وَإِنْ كَانَ فِيهِ ضَعْفٌ لَكِنَّهُ يَصْلُحُ لِلْمُتَابَعَةِ আনাস (রাঃ) বর্ণিত উক্ত হাদীছটির মধ্যে কিছু দুর্বলতা থাকলেও এটিকে সহযোগী হিসাবে গ্রহণ করা যায়’।[6]
উক্ত দীর্ঘ কবিতা সম্পর্কে সীরাতে ইবনে হিশামের ভাষ্যকার আব্দুর রহমান সুহায়লী (মৃ. ৫৮১ হি.) বলেন, আবু তালেব স্বীয় পিতা আব্দুল মুত্ত্বালিবের সময়ে এটা দেখেছেন যে, অনাবৃষ্টিতে কাতর মক্কাবাসীদের জন্য বৃষ্টি প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তিনি নারী-পুরুষ সবাইকে নিয়ে কা‘বাগৃহে জমা হন এবং আল্লাহর নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করেন। এ সময় শিশু মুহাম্মাদ তাঁর পাশে ছিল এবং তিনি তাকে কাঁধে তুলে নেন। অতঃপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হয় (ইবনু হিশাম ১/২৮১, টীকা-২) তবে উক্ত প্রার্থনায় আব্দুল মুত্ত্বালিব উপস্থিত নারী-পুরুষ সকলের দোহাই দিয়েছেন। অতএব উক্ত ঘটনায় মুহাম্মাদের পৃথক বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হয় না।
কিশোর মুহাম্মাদ ও ব্যবসায় গমন::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
১০ বা ১২ বছর বয়সে চাচার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে তিনি সর্বপ্রথম সিরিয়ার বুছরা (بُصْرَى) শহরে গমন করেন। সেখানে জিরজীস (جِرْجِيْس) ওরফে বাহীরা (بَحِيرَى) নামক জনৈক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাহেব অর্থাৎ খ্রিষ্টান পাদ্রীর সাথে সাক্ষাৎ হ’লে তিনি মক্কার কাফেলাকে আন্তরিক আতিথেয়তায় আপ্যায়িত করেন এবং কিশোর মুহাম্মাদের হাত ধরে কাফেলা নেতা আবু ত্বালেবকে বলেন,هَذَا سَيِّدُ الْعَالَمِيْنَ هَذَا يَبْعَثُهُ اللهُ رَحْمَةً لِِّلْعَالَمِيْنَ ‘এই বালক বিশ্ব জাহানের নেতা। একে আল্লাহ বিশ্ব চরাচরের রহমত হিসাবে প্রেরণ করবেন’। আবু ত্বালেব বললেন, কিভাবে আপনি একথা বুঝলেন? তিনি বললেন, গিরিপথের অপর প্রান্ত থেকে যখন আপনাদের কাফেলা দৃষ্টি গোচর হচ্ছিল, তখন আমি খেয়াল করলাম যে, সেখানে এমন কোন প্রস্তরখন্ড বা বৃক্ষ ছিল না, যে এই বালকের প্রতি সিজদায় পতিত হয়নি। আর নবী ব্যতীত এরা কাউকে সিজদা করে না। তাছাড়া মেঘ তাঁকে ছায়া করছিল। গাছ তার প্রতি নুইয়ে পড়ছিল। এতদ্ব্যতীত ‘মোহরে নবুঅত’ দেখে আমি তাকে চিনতে পেরেছি, যা তার (বাম) স্কন্ধমূলে ছোট্ট ফলের আকৃতিতে উঁচু হয়ে আছে। আমাদের ধর্মগ্রন্থে আখেরী নবীর এসব আলামত সম্পর্কে আমরা আগেই জেনেছি। অতএব হে আবু ত্বালেব! আপনি সত্বর একে মক্কায় পাঠিয়ে দিন। নইলে ইহূদীরা জানতে পারলে ওকে মেরে ফেলতে পারে’ অতঃপর চাচা তাকে কিছু গোলামের সাথে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। এ সময় পাদ্রী তাকে পিঠা ও তৈল উপহার দেন।[1]
ইবনু ইসহাক বলেন, পাদ্রী বাহীরা তাকে পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে লাত ও ‘উযযার দোহাই দিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন। তখন তরুণ মুহাম্মাদ তাকে বলেন, আমাকে লাত ও ‘উযযার নামে কোন প্রশ্ন করবেন না। আল্লাহর কসম! আমি এদু’টির চাইতে কোন কিছুর প্রতি অধিক বিদ্বেষ পোষণ করি না। অতঃপর তিনি তাকে তার নিদ্রা, আচরণ-আকৃতি ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। সেগুলিতে তিনি তাদের কিতাবে বর্ণিত গুণাবলীর সাথে মিল পান। অতঃপর তিনি আবু তালিবকে বলেন, ছেলেটি কে? আবু তালিব বলেন, এটি আমার বেটা। তিনি বললেন, না। এটি আপনার পুত্র নয়। এই ছেলের বাপ জীবিত থাকতে পারেন না। তখন আবু তালিব বললেন, এটি আমার ভাতিজা। বাহীরা বললেন, তার পিতা কি করেন? জবাবে আবু তালিব বলেন, তিনি মারা গেছেন এমতাবস্থায় যে তার মা গর্ভবতী ছিলেন। বাহীরা বললেন, আপনি সত্য বলেছেন। আপনি ভাতিজাকে নিয়ে আপনার শহরে চলে যান এবং ইহূদীদের থেকে সাবধান থাকবেন। ... আপনার ভাতিজার মহান মর্যাদা রয়েছে’ (ইবনু হিশাম ১/১৮২)।
কিছু কিছু খ্রিষ্টান প্রাচ্যবিদ এই ঘটনা থেকে নবী চরিত্রের উপরে অপবাদ দিতে চেষ্টা করেছেন যে, তিনি পাদ্রী বাহীরা-র নিকট থেকে তাওরাত শিখেছিলেন। যা থেকে তিনি কুরআন বর্ণনা করেছেন।[2] অথচ তখন তাওরাত বা ইনজীল আরবীতে অনূদিত হয়নি। তাছাড়া মুহাম্মাদ (ছাঃ) তখন ছিলেন মাত্র ১০/১২ বছরের বালক। যিনি মাতৃভাষা আরবীতেই লেখাপড়া জানতেন না (আনকাবুত ২৯/৪৮)। তিনি ও তাঁর বংশের সবাই ছিলেন উম্মী বা নিরক্ষর। তাহ’লে কিভাবে এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে তিনি পাদ্রীর নিকট থেকে তাওরাত শিখলেন, যা হিব্রু ভাষায় লিখিত। কিভাবে তিনি তার অর্থ বুঝলেন? অতঃপর সেগুলি কিভাবে সাক্ষাতের ২৮/৩০ বছর পর আরবীতে পরিবর্তন করে ‘কুরআন’ আকারে পেশ করলেন?
১০ বা ১২ বছর বয়সে চাচার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে তিনি সর্বপ্রথম সিরিয়ার বুছরা (بُصْرَى) শহরে গমন করেন। সেখানে জিরজীস (جِرْجِيْس) ওরফে বাহীরা (بَحِيرَى) নামক জনৈক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাহেব অর্থাৎ খ্রিষ্টান পাদ্রীর সাথে সাক্ষাৎ হ’লে তিনি মক্কার কাফেলাকে আন্তরিক আতিথেয়তায় আপ্যায়িত করেন এবং কিশোর মুহাম্মাদের হাত ধরে কাফেলা নেতা আবু ত্বালেবকে বলেন,هَذَا سَيِّدُ الْعَالَمِيْنَ هَذَا يَبْعَثُهُ اللهُ رَحْمَةً لِِّلْعَالَمِيْنَ ‘এই বালক বিশ্ব জাহানের নেতা। একে আল্লাহ বিশ্ব চরাচরের রহমত হিসাবে প্রেরণ করবেন’। আবু ত্বালেব বললেন, কিভাবে আপনি একথা বুঝলেন? তিনি বললেন, গিরিপথের অপর প্রান্ত থেকে যখন আপনাদের কাফেলা দৃষ্টি গোচর হচ্ছিল, তখন আমি খেয়াল করলাম যে, সেখানে এমন কোন প্রস্তরখন্ড বা বৃক্ষ ছিল না, যে এই বালকের প্রতি সিজদায় পতিত হয়নি। আর নবী ব্যতীত এরা কাউকে সিজদা করে না। তাছাড়া মেঘ তাঁকে ছায়া করছিল। গাছ তার প্রতি নুইয়ে পড়ছিল। এতদ্ব্যতীত ‘মোহরে নবুঅত’ দেখে আমি তাকে চিনতে পেরেছি, যা তার (বাম) স্কন্ধমূলে ছোট্ট ফলের আকৃতিতে উঁচু হয়ে আছে। আমাদের ধর্মগ্রন্থে আখেরী নবীর এসব আলামত সম্পর্কে আমরা আগেই জেনেছি। অতএব হে আবু ত্বালেব! আপনি সত্বর একে মক্কায় পাঠিয়ে দিন। নইলে ইহূদীরা জানতে পারলে ওকে মেরে ফেলতে পারে’ অতঃপর চাচা তাকে কিছু গোলামের সাথে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। এ সময় পাদ্রী তাকে পিঠা ও তৈল উপহার দেন।[1]
ইবনু ইসহাক বলেন, পাদ্রী বাহীরা তাকে পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে লাত ও ‘উযযার দোহাই দিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন। তখন তরুণ মুহাম্মাদ তাকে বলেন, আমাকে লাত ও ‘উযযার নামে কোন প্রশ্ন করবেন না। আল্লাহর কসম! আমি এদু’টির চাইতে কোন কিছুর প্রতি অধিক বিদ্বেষ পোষণ করি না। অতঃপর তিনি তাকে তার নিদ্রা, আচরণ-আকৃতি ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। সেগুলিতে তিনি তাদের কিতাবে বর্ণিত গুণাবলীর সাথে মিল পান। অতঃপর তিনি আবু তালিবকে বলেন, ছেলেটি কে? আবু তালিব বলেন, এটি আমার বেটা। তিনি বললেন, না। এটি আপনার পুত্র নয়। এই ছেলের বাপ জীবিত থাকতে পারেন না। তখন আবু তালিব বললেন, এটি আমার ভাতিজা। বাহীরা বললেন, তার পিতা কি করেন? জবাবে আবু তালিব বলেন, তিনি মারা গেছেন এমতাবস্থায় যে তার মা গর্ভবতী ছিলেন। বাহীরা বললেন, আপনি সত্য বলেছেন। আপনি ভাতিজাকে নিয়ে আপনার শহরে চলে যান এবং ইহূদীদের থেকে সাবধান থাকবেন। ... আপনার ভাতিজার মহান মর্যাদা রয়েছে’ (ইবনু হিশাম ১/১৮২)।
কিছু কিছু খ্রিষ্টান প্রাচ্যবিদ এই ঘটনা থেকে নবী চরিত্রের উপরে অপবাদ দিতে চেষ্টা করেছেন যে, তিনি পাদ্রী বাহীরা-র নিকট থেকে তাওরাত শিখেছিলেন। যা থেকে তিনি কুরআন বর্ণনা করেছেন।[2] অথচ তখন তাওরাত বা ইনজীল আরবীতে অনূদিত হয়নি। তাছাড়া মুহাম্মাদ (ছাঃ) তখন ছিলেন মাত্র ১০/১২ বছরের বালক। যিনি মাতৃভাষা আরবীতেই লেখাপড়া জানতেন না (আনকাবুত ২৯/৪৮)। তিনি ও তাঁর বংশের সবাই ছিলেন উম্মী বা নিরক্ষর। তাহ’লে কিভাবে এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে তিনি পাদ্রীর নিকট থেকে তাওরাত শিখলেন, যা হিব্রু ভাষায় লিখিত। কিভাবে তিনি তার অর্থ বুঝলেন? অতঃপর সেগুলি কিভাবে সাক্ষাতের ২৮/৩০ বছর পর আরবীতে পরিবর্তন করে ‘কুরআন’ আকারে পেশ করলেন?
তরুণ মুহাম্মাদ ও ‘ফিজার’ যুদ্ধ ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
তিনি যখন পনের কিংবা বিশ বছর বয়সে উপনীত হন, তখন ‘ফিজার যুদ্ধ’(حَرْبُ الْفِجَارِ) শুরু হয়। এই যুদ্ধে একপক্ষে ছিল কুরায়েশ ও তাদের মিত্র বনু কিনানাহ এবং অপর পক্ষে ছিল ক্বায়েস আয়লান। যুদ্ধে কুরায়েশ পক্ষের জয় হয়। কিন্তু এ যুদ্ধের ফলে ‘হারাম’ মাস (যে মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ) এবং কা‘বার পবিত্রতা বিনষ্ট হয় বলে একে ‘হারবুল ফিজার’ বা দুষ্টুদের যুদ্ধ বলা হয়। তরুণ মুহাম্মাদ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং চাচাদের তীর যোগান দেবার কাজে সহায়তা করেন বলে যে বর্ণনা বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে রয়েছে, তা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। বরং এটাই সঠিক যে, আল্লাহপাক তাঁকে হারাম মাসে যুদ্ধে অংশগ্রহণের পাপ থেকে রক্ষা করেন। যেমন জন্ম থেকেই আল্লাহ তাঁকে সকল মন্দকর্ম থেকে রক্ষা করেছেন
নবীর নিষ্পাপত্ব:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
বিদ্বানগণ এ বিষয়ে একমত যে, সকল নবীই নিষ্পাপ ছিলেন। আর শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) নবী হওয়ার আগে ও পরে যাবতীয় কুফরী থেকে এবং অহী প্রাপ্তির পরে কবীরা গোনাহের সংকল্প থেকেও নিষ্পাপ ছিলেন। ইচ্ছাকৃতভাবে ছগীরা গোনাহ জায়েয ছিল। তাঁদের এই বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, কুফরী ও কবীরা গোনাহ থেকে তিনি নবুঅত লাভের পূর্ব হ’তেই নিষ্পাপ ছিলেন। যেমন
(১) তিনি কুরায়েশদের নিয়ম অনুযায়ী হজ্জের সময় কখনো তাদের সাথে মুযদালিফায় অবস্থান করেননি। বরং অন্যদের সাথে আরাফাতে অবস্থান করতেন। তাঁকে সেখানে দেখে একবার জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম আশ্চর্য হয়ে বলে উঠেছিলেন, وَاللهِ مِنَ الْحُمْسِ فَمَا شَأْنُهُ هَا هُنَا ‘আল্লাহর কসম! এ তো হুম্স-দের সন্তান। তার কি হয়েছে যে, সে এখানে অবস্থান করছে?
(২) তিনি কখনো মূর্তি স্পর্শ করেননি। একবার তিনি স্বীয় মুক্তদাস যায়েদ বিন হারেছাহকে নিয়ে কা‘বাগৃহ তাওয়াফ করছিলেন। সে সময় যায়েদ মূর্তিকে স্পর্শ করলে তিনি তাকে নিষেধ করেন। দ্বিতীয়বার যায়েদ আরেকটি মূর্তিকে স্পর্শ করেন বিষয়টির নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। তিনি পুনরায় তাকে নিষেধ করেন। এরপর থেকে নবুঅত লাভের আগ পর্যন্ত যায়েদ কখনো মূর্তি স্পর্শ করেননি। তিনি কসম করে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনোই মূর্তি স্পর্শ করেননি। অবশেষে আল্লাহ তাকে অহী প্রেরণের মাধ্যমে সম্মানিত করেন।
(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনোই মূর্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীত পশুর গোশত কিংবা যার উপরে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, এমন কোন গোশত ভক্ষণ করেননি’(বুখারী ফৎহসহ হা/৫৪৯৯)।
(৪) কা‘বা পুনর্নির্মাণ কালে দূর থেকে পাথর বহন করে আনার সময় চাচা আববাসের প্রস্তাবক্রমে তিনি কাপড় খুলে ঘাড়ে রাখেন। ফলে তিনি সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। অতঃপর হুঁশ ফিরলে তিনি পাজামা কঠিনভাবে বেঁধে দিতে বলেন’ (বুখারী, মুসলিম) যদিও বিষয়টি সেযুগে কোনই লজ্জাকর বিষয় ছিল না। ইবনু হাজার আসক্বালানী উক্ত হাদীছের আলোচনায় বলেন, ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ স্বীয় নবী-কে নবুঅতের পূর্বে ও পরে সকল মন্দকর্ম থেকে হেফাযত করেন’।
(৫) আল্লাহ তাঁর আগে-পিছের সকল গোনাহ মাফ করে দিয়েছেন (বুখারী হা/৭৪১০)। তাই তিনি ছিলেন আল্লাহর মনোনীত নিষ্পাপ রাসূল[4]- ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (আল্লাহ তাঁর উপরে অনুগ্রহ করুন ও শান্তি বর্ষণ করুন!)।
বিবাহ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
ব্যবসায়ে অভাবিত সাফল্যে খাদীজা দারুণ খুশী হন। অন্যদিকে গোলাম মায়সারার কাছে মুহাম্মাদের মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারী এবং উন্নত চিন্তা-চেতনার কথা শুনে বিধবা খাদীজা মুহাম্মাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়েন। ইতিপূর্বে পরপর দু’জন স্বামী মৃত্যুবরণ করায় মক্কার সেরা নেতৃবৃন্দ তাঁর নিকটে বিয়ের পয়গাম পাঠান। কিন্তু তিনি কোনটাই গ্রহণ করেননি। এবার তিনি নিজেই বান্ধবী নাফীসার মাধ্যমে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠালেন যুবক মুহাম্মাদ-এর কাছে। তখন উভয় পক্ষের মুরববীদের সম্মতিক্রমে শাম থেকে ফিরে আসার মাত্র দু’মাসের মাথায় সমাজনেতাদের উপস্থিতিতে ধুমধামের সাথে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। মুহাম্মাদ স্বীয় বিবাহের মোহরানা স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। এ সময় খাদীজা ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ ধনী ও সম্ভ্রান্ত মহিলা এবং সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারিণী হিসাবে ‘ত্বাহেরা’ (পবিত্রা) নামে খ্যাত। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫ মুহাম্মাদ ছিলেন খাদীজার তৃতীয় স্বামী। অন্যদিকে খাদীজা ছিলেন মুহাম্মাদের প্রথমা স্ত্রী।উভয়ের দাম্পত্য জীবন পঁচিশ বছর স্থায়ী হয়। মৃত্যুকালে খাদীজার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তবে উভয়ের বয়স নিয়ে মতভেদ আছে।
সন্তান::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::;::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
তাঁর মোট ৩ পুত্র ও ৪ কন্যা ছিল। ইবরাহীম ব্যতীত বাকী ৬ সন্তানের সবাই ছিলেন খাদীজার গর্ভজাত। তিনি বেঁচে থাকা অবধি রাসূল (ছাঃ) দ্বিতীয় বিবাহ করেননি।[1] মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে বিয়ের সময় খাদীজা পূর্ব স্বামীদ্বয়ের কয়েকজন জীবিত সন্তানের মা ছিলেন। তাঁর গর্ভজাত ও পূর্বস্বামীর সন্তানেরা সকলে ইসলাম কবুল করেন ও সকলে ছাহাবী ছিলেন। খাদীজার গর্ভে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রথম সন্তান ছিল ক্বাসেম। তার নামেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপনাম ছিল আবুল ক্বাসেম। অতঃপর কন্যা যয়নব, পুত্র আব্দুল্লাহ; যার লকব ছিল ত্বাইয়িব ও ত্বাহের। কারণ তিনি নবুঅত লাভের পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর রুক্বাইয়া, উম্মে কুলছূম ও ফাতেমা। ক্বাসেম ছিলেন সন্তানদের মধ্যে সবার বড়। যিনি ১৭ মাস বয়সে মারা যান। নবুঅত লাভের পর আব্দুল্লাহ জন্ম গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করায় ‘আছ বিন ওয়ায়েল প্রমুখ কুরায়েশ নেতারা রাসূল (ছাঃ)-কে ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলে অভিহিত করেন। কেননা সে যুগে কারু পুত্র সন্তান মারা গেলে এবং পরে পুত্র সন্তান হ’তে দেরী হ’লে আরবরা ঐ ব্যক্তিকে ‘আবতার’ বলত। অতঃপর চার কন্যার মধ্যে কে সবার বড় ও কে সবার ছোট এ নিয়ে মতভেদ আছে। তবে প্রসিদ্ধ মতে যয়নব বড় ও ফাতেমা ছিলেন ছোট।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মোট সাত সন্তানের ছয় জনই তাঁর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মধ্যে পুত্রগণ শৈশবে মারা যান। কন্যাগণ সকলে বিবাহিতা হন ও হিজরত করেন। কিন্তু ফাতেমা ব্যতীত বাকী তিন কন্যা রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর ছয় মাস পরে ফাতেমা (রাঃ) মারা যান। রাসূল (ছাঃ)-এর সর্বশেষ সন্তান ছিলেন পুত্র ‘ইবরাহীম’। তিনি ছিলেন মিসরীয় দাসী মারিয়া ক্বিবতীয়ার গর্ভজাত। যিনি মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং দুধ ছাড়ার আগেই মাত্র ১৮ মাস বয়সে ১০ম হিজরীর ২৯শে শাওয়াল মোতাবেক ৬৩২ খৃষ্টাব্দের ২৭ অথবা ৩০শে জানুয়ারী সূর্য গ্রহণের দিন সোমবার মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
কা‘বাগৃহ পুনর্নির্মাণ ও মুহাম্মাদের মধ্যস্থতা ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
আল-আমীন মুহাম্মাদ-এর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন কুরায়েশ নেতাগণ কা‘বাগৃহ ভেঙ্গে পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ইবরাহীম ও ইসমাঈলের হাতে গড়া ন্যূনাধিক আড়াই হাযার বছরের স্মৃতিধন্য এই মহা পবিত্র গৃহ সংস্কারের ও পুনর্নির্মাণের পবিত্র কাজে সকলে অংশীদার হ’তে চায়।
ইবরাহীমী যুগ থেকেই কা‘বাগৃহ ৯ হাত উঁচু চার দেওয়াল বিশিষ্ট ঘর ছিল, যার কোন ছাদ ছিল না। কা‘বা অর্থই হ’ল চতুর্দেওয়াল বিশিষ্ট ঘর। চার পাশের উঁচু পাহাড় থেকে নামা বৃষ্টির স্রোতের আঘাতে কা‘বার দেওয়াল ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া সে বছরের তীব্র বন্যায় কা‘বা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। অধিকন্তু একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঐ সময় ঘটে যায়, যা ইতিপূর্বে কখনো ঘটেনি এবং যা কা‘বা পুনর্নির্মাণে প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে কাজ করে। ঘটনাটি ছিল এই যে, কিছু চোর দেওয়াল টপকে কা‘বা গৃহে প্রবেশ করে এবং সেখানে রক্ষিত মূল্যবান মালামাল ও অলংকারাদি চুরি করে নিয়ে যায়।
কা‘বাগৃহ পুনর্নির্মাণের উদ্দেশ্যে কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসে স্থির করেন যে, এর নির্মাণ কাজে কারু কোনরূপ হারাম মাল ব্যয় করা হবে না। তারা বলেন, হে কুরায়েশগণ! তোমরা এর নির্মাণ কাজে তোমাদের পবিত্র উপার্জন থেকে ব্যয় কর। এর মধ্যে ব্যভিচারের অর্থ, সূদের অর্থ, কারু প্রতি যুলুমের অর্থ মিশ্রিত করোনা’ (ইবনু হিশাম ১/১৯৪) অতঃপর কোন কোন গোত্র মিলে কোন পাশের দেওয়াল নির্মাণ করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। সাথে সাথে এবার ছাদ নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা ইতিপূর্বে ছিল না। কিন্তু কে আগে দেওয়াল ভাঙ্গার সূচনা করবে? অবশেষে অলীদ বিন মুগীরাহ মাখযূমী সাহস করে প্রথম ভাঙ্গা শুরু করেন। তারপর সকলে মিলে দেওয়াল ভাঙ্গা শেষ করে ইবরাহীম (আঃ)-এর স্থাপিত ভিত পর্যন্ত গিয়ে ভাঙ্গা বন্ধ করে দেন। অতঃপর সেখান থেকে নতুনভাবে সর্বোত্তম পাথর দিয়ে ‘বাকূম’ (باقوم بنّاء رومى) নামক জনৈক রোমক কারিগরের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকার্য শুরু হয়। কিন্তু গোল বাঁধে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ‘হাজারে আসওয়াদ’ স্থাপনের পবিত্র দায়িত্ব কোন গোত্র পালন করবে সেটা নিয়ে। এই বিবাদ অবশেষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গড়াবার আশংকা দেখা দিল। তখন প্রবীণ নেতা আবু উমাইয়া মাখযূমী প্রস্তাব করলেন যে, আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম ‘হারামে’ প্রবেশ করবেন, তিনিই এই সমস্যার সমাধান করবেন। সবাই এ প্রস্তাব মেনে নিল।
আল্লাহর অপার মহিমা। দেখা গেল যে, বনু শায়বাহ ফটক দিয়ে সকালে সবার আগে মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন সকলের প্রিয় ‘আল-আমীন’। কা‘বা নির্মাণে অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী রাবী আব্দুল্লাহ বিন সায়েব আল-মাখযূমীর বর্ণনা মতে তাকে দেখে সবাই বলে উঠলো- هَذَا الْأَمِينُ، رَضِينَا، هَذَامُحَمَّدٌ ‘এই যে আল-আমীন। আমরা তাঁর উপর সন্তুষ্ট। এই যে মুহাম্মাদ’ অতঃপর তিনি ঘটনা শুনে একটা চাদর চাইলেন এবং সেটা বিছিয়ে নিজ হাতে ‘হাজারে আসওয়াদ’ উঠিয়ে তার মাঝখানে রেখে দিলেন। অতঃপর নেতাদের বললেন, আপনারা সকলে মিলে চাদরের চারপাশ ধরে নিয়ে চলুন। তাই করা হ’ল। কা‘বার নিকটে গেলে তিনি পাথরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন।[1] এই দ্রুত ও সহজ সমাধানে সবাই সন্তুষ্ট হয়ে মুহাম্মাদের তারীফ করতে করতে চলে গেল। আরবরা এমন এক যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেল, যা ২০ বছরেও শেষ হ’ত কি-না সন্দেহ। এ ঘটনায় সমগ্র আরবে তাঁর প্রতি ব্যাপক শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠলো। নেতাদের মধ্যে তাঁর প্রতি একটা স্বতন্ত্র সম্ভ্রমবোধ সৃষ্টি হ’ল।
উল্লেখ্য যে, নবুঅত লাভের পূর্ব পর্যন্ত কুরায়েশগণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে শ্রদ্ধাভরে আল-আমীন (الْأَمِينُ) বলেই ডাকত’ (ইবনু হিশাম ১/১৯৮)।
কা‘বাগৃহ নির্মাণের এক পর্যায়ে উত্তরাংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত বনু ‘আদী বিন কা‘ব বিন লুওয়াই তাদের হালাল অর্থের কমতি থাকায় কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে মূল ভিতের ঐ অংশের প্রায় সাত হাত জায়গা বাদ রেখেই দেওয়াল নির্মাণ করা হয়। যা হাত্বীম (الْحَطِيم) বা পরিত্যক্ত নামে আজও ঐভাবে আছে। সেকারণ হাতীমের বাহির দিয়েই ত্বাওয়াফ করতে হয়, ভিতর দিয়ে নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কা বিজয়ের পরে ঐ অংশটুকু কা‘বার মধ্যে শামিল করে মূল ইবরাহীমী ভিতের উপর কা‘বা পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নওমুসলিম কুরায়েশরা সেটা মেনে নিবে না ভেবে বিরত থাকেন’ (বুখারী হা/১৫৮৬)। একারণেই বলা হয়ে থাকে, دَرْءُ الْمَفَاسِدِ أَوْلَى مِنْ جَلْبِ الْمَصَالِحِ ‘মন্দ প্রতিরোধ অধিক উত্তম কল্যাণ আহরণের চাইতে’। উল্লেখ্য যে, হিজরতের ১৮ বছর পূর্বে কা‘বাগৃহ পুনর্নির্মাণ সমাপ্ত হয়’ (ইবনু হিশাম ১/১৯৭-এর টীকা-৩)।
কা‘বার আকৃতি ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
কুরায়েশ নির্মিত চতুষ্কোণ বিশিষ্ট কা‘বা (যার রূপ বর্তমানে রয়েছে), তার দেওয়ালের উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার। উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়াল দশ দশ মিটার এবং পূর্ব ও পশ্চিম দেওয়াল বারো বারো মিটার করে প্রশস্ত। ৬টি খাম্বার উপরে নির্মিত ছাদ। মাত্বাফ থেকে দেড় মিটার উচ্চতায় দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ‘হাজারে আসওয়াদ’ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ‘রুকনে ইয়ামানী’ অবস্থিত। দরজার নীচের চৌকাঠ ২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত (আর-রাহীক্ব পৃঃ ৬২) অথচ রাসূল (ছাঃ)-এর ইচ্ছা ছিল, হাত্বীমকে অন্তর্ভুক্ত করে মূল ভিতের উপর কা‘বাগৃহ নির্মাণ করা, যা মাটি সমান হবে। যার পূর্ব দরজা দিয়ে মুছল্লী প্রবেশ করবে ও ছালাত শেষে পশ্চিম দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু কুরায়েশরা তা না করে অনেক উঁচুতে দরজা নির্মাণ করে। যাতে তাদের ইচ্ছার বাইরে কেউ সেখানে প্রবেশ করতে না পারে’।[1]
খালা আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট এ হাদীছ শোনার পর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রাঃ) স্বীয় খেলাফতকালে (৬৪-৭৩ হিঃ) ৬৪ হিজরী সনে কা‘বাগৃহ ভেঙ্গে রাসূল (ছাঃ)-এর ইচ্ছানুযায়ী তা পুনর্নির্মাণ করেন। কিন্তু ৭৩ হিজরী সনে তিনি যুদ্ধে নিহত হ’লে উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে গভর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তা পুনরায় ভেঙ্গে আগের মত হাত্বীমকে বাইরে রেখে নির্মাণ করেন। যা আজও রয়েছে। পরবর্তীতে আববাসীয় খলীফা মাহদী ও হারূণ এটি পুনর্নির্মাণ করে রাসূল (ছাঃ)-এর ইচ্ছা পূরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম মালেক (৯৩-১৭৯ হি.) তাদের বলেন, لاَ تَجْعَلْكَعْبَةَ اللهِ مَلْعَبَةً لِلْمُلُوْكِ ‘আপনারা কা‘বাগৃহকে রাজা-বাদশাহদের খেল-তামাশার বস্ত্ততে পরিণত করবেন না’।[2] ফলে কা‘বাগৃহ ঐ অবস্থায় রয়ে যায়। ইবরাহীমী ভিতে আজও ফিরে আসেনি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আকাংখাও পূর্ণ হয়নি।
শেষনবী::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
(ক) আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে শেষনবী হিসাবে মনোনীত করেন। তিনি বলেন,مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন। বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষনবী’ (আহযাব ৩৩/৪০)।[1] তিনি বলেন, اللهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ ‘আল্লাহ সর্বাধিক অবগত কার নিকটে তিনি রিসালাত সমর্পণ করবেন’ (আন‘আম ৬/১২৪)। কেননা وَاللهُ يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَن يَّشَاءُ- ‘আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহের জন্য যাকে চান তাকে খাছ করে নেন’ (বাক্বারাহ ২/১০৫)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ مَثَلِى وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِى كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلاَّ مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلاَّ وُضِعَتْ هَذِهِاللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ- ‘আমি ও আমার পূর্বেকার নবীগণের তুলনা ঐ ব্যক্তির ন্যায় যিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেছেন। অতঃপর সেটিকে খুবই সুন্দর ও আকর্ষণীয় করেছেন। কিন্তু কোণায় একটি জায়গা খালি রেখেছেন। তখন লোকেরা ঐ স্থানটি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে এবং বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকে ও বলতে থাকে, কেন এখানে একটি ইট দেওয়া হয়নি? রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমিই সেই ইট এবং আমিই শেষনবী’।[2] لاَ نَبِىَّ بَعْدِى‘আমার পরে আর কোন নবী নেই’।[3] তিনি বলেন,بُعِثْتُ إِلَى الأَحْمَرِ وَالأَسْوَدِ، وَكَانَ النَّبِىُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً- ‘আমি লাল ও কালো সকলের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। অন্য নবীগণ নির্দিষ্টভাবে স্ব স্ব গোত্রের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। কিন্তু আমি মানবজাতির সকলের জন্য প্রেরিত হয়েছি’।[4] আল্লাহ বলেন,وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلاَّ كَافَّةً لِلنَّاسِ ‘আমরা তোমাকে পুরা মানবজাতির প্রতি প্রেরণ করেছি’ (সাবা ৩৪/২৮) অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,فَأَرْسَلَهُ إِلَى الْجِنِّ وَالإِنْسِ ‘অতঃপর আল্লাহ তাঁকে জিন ও ইনসানের প্রতি প্রেরণ করেন’।[5] আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,وَأُرْسِلْتُ إِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِىَ النَّبِيُّونَ ‘আমাকে পুরা সৃষ্টি জগতের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমাকে দিয়েই নবীদের সিলসিলা সমাপ্ত করা হয়েছে’।[6]
বর্তমান পৃথিবীর সকল জিন ও ইনসান শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উম্মত। যারা তাঁর দ্বীন কবুল করেছে, তারা হ’ল ‘উম্মাতুল ইজাবাহ’ (أُمَّةُ الْإِجَابَةِ)অর্থাৎ মুসলিম। আর যারা তাঁর দ্বীন কবুল করেনি, তারা হ’ল ‘উম্মাতুদ দা‘ওয়াহ’ (أُمَّةُ الدَّعْوَةِ) অর্থাৎ কাফির-মুশরিকগণ, যাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতে হবে। যেহেতু আর কোন শরী‘আত নিয়ে আর কোন নবী আসবেন না, সেকারণ ক্বিয়ামত পর্যন্ত সকল জিন-ইনসান শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উম্মত। মুসলমানের কর্তব্য হ’ল শেষনবী (ছাঃ)-এর আনীত ইসলামী শরী‘আত নিজেরা মেনে চলা এবং দুনিয়াবাসীকে তা মেনে চলার আহবান জানানো। কেননা হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন,وَالَّذِى نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ يَسْمَعُ بِى أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ يَهُودِىٌّ وَلاَ نَصْرَانِىٌّ ثُمَّيَمُوْتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِى أُرْسِلْتُ بِهِ إِلاَّ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ ‘যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁর কসম করে বলছি, ইহূদী হৌক বা নাছারা হৌক এই উম্মতের যে কেউ আমার আগমনের খবর শুনেছে, অতঃপর মৃত্যুবরণ করেছে, অথচ আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার উপরে ঈমান আনেনি, সে ব্যক্তি অবশ্যই জাহান্নামী হবে’।[7]
মূলতঃ খতমে নবুঅতের আক্বীদার মধ্যেই বিশ্ব মুসলিম ও বিশ্ব মানবতার ঐক্য ও অগ্রগতি নির্ভর করে। এই ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য শয়তান শুরু থেকেই চেষ্টা চালিয়েছে এবং এখনও চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উম্মতকে সাবধান করে বলেন, ‘অতদিন ক্বিয়ামত হবে না, যতদিন না আমার উম্মতের কিছু গোত্র মুশরিকদের সঙ্গে মিশে যাবে এবং মূর্তিপূজা করবে। আর সত্ত্বর আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদীর জন্ম হবে। যাদের প্রত্যেকে ধারণা করবে যে, সে নবী (كَذَّابُونَ ثَلاَثُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِىٌّ)। অথচ আমি শেষনবী। আমার পরে কোন নবী নেই। আর আমার উম্মতের মধ্যে চিরদিন একটি দল হক-এর উপরে বিজয়ী থাকবে, বিরোধীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এভাবেই আল্লাহর নির্দেশ (ক্বিয়ামত) এসে যাবে’ (আবুদাঊদ হা/৪২৫২)রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় ছান‘আর আসওয়াদ ‘আনাসী ও ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাব (মুসলিম হা/২২৭৪) এবং তাঁর মৃত্যুর পরে আরও কয়েকজন সহ এ যুগে মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮ খৃ.) তাদের অন্যতম।
(খ) নবীগণের অঙ্গীকার (ميثاق الأنبياء) :
আখেরী নবীর প্রতি ঈমান আনা ও তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করার জন্য পূর্বেই আল্লাহ নবীগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। যেমন তিনি বলেন,وَإِذْ أَخَذَ اللهُ مِيْثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَامَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِيْنَ- ‘আর যখন আল্লাহ নবীগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিলেন এই মর্মে যে, আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত যা দান করেছি, এরপরে যদি কোন রাসূল আসেন, যিনি তোমাদেরকে প্রদত্ত কিতাবের সত্যায়ন করবেন, তাহ’লে অবশ্যই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং অবশ্যই তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, তোমরা কি এতে স্বীকৃতি দিচ্ছ এবং তোমাদের স্বীকৃতির উপর আমার অঙ্গীকার নিচ্ছ? তারা বলল, আমরা স্বীকৃতি দিলাম। তিনি বললেন, তাহ’লে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে অন্যতম সাক্ষী রইলাম’ (আলে ইমরান ৩/৮১)।[8]
(গ) আহলে কিতাব পন্ডিতদের অঙ্গীকার (ميثاق أحبار أهل الكتاب للإيمان على محمد):
আহলে কিতাব পন্ডিতগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয় এই মর্মে যে, তারা যেন সত্য গোপন না করে এবং শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ও তাঁর প্রতি ঈমান আনার বিষয়টি লোকদের নিকট প্রকাশ করে। যেমন আল্লাহ বলেন,وَإِذْ أَخَذَ اللهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلاَ تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْوَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ ‘আর আল্লাহ যখন আহলে কিতাবদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমরা অবশ্যই (শেষনবী মুহাম্মাদের আগমন ও তার উপর ঈমান আনার বিষয়টি) লোকদের নিকট বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না। অতঃপর তারা তা পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং গোপন করার বিনিময়ে তা স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করল। কতই না নিকৃষ্ট তাদের ক্রয়-বিক্রয়’ (আলে-ইমরান ৩/১৮৭)।
ইবনু কাছীর বলেন, অত্র আয়াতে ইহূদী-নাছারা পন্ডিতদের ধমক দেওয়া হয়েছে ও ধিক্কার জানানো হয়েছে এ কারণে যে, তারা নিকৃষ্ট দুনিয়াবী স্বার্থে পূর্বেকার সেই অঙ্গীকার ভুলে গেছে এবং লোকদের নিকট উক্ত অঙ্গীকারের কথা চেপে গেছে। এই অঙ্গীকারের কথা তাদের নবীগণের মাধ্যমে তাদের ধর্মনেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়। কতই না নিকৃষ্ট ছিল তাদের হাতের উপর হাত রাখা এবং কতই না নিকৃষ্ট ছিল তাদের বায়‘আত গ্রহণ করা। তিনি বলেন, এর মধ্যে মুসলিম আলেমদের জন্য সতর্কবাণী রয়েছে, যেন তারা আহলে কিতাবদের মত না হন এবং তারা যেন সৎকর্মের কোন ইলম গোপন না করেন(ঐ, তাফসীর)।
(ঘ) ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী (بشارة عيسى ) :
পূর্বের নবীগণের ন্যায় আহলে কিতাবগণের শেষনবী ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে উদ্দেশ্য করে সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদের আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন,وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّراً بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّاجَاءهُم بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ ‘স্মরণ কর, যখন মরিয়ম-তনয় ঈসা বলেছিল, হে বনু ইস্রাঈলগণ! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রাসূল-এর সুসংবাদ দানকারী, যিনি আমার পরে আগমন করবেন, তার নাম হবে ‘আহমাদ’। অতঃপর যখন তিনি তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ আগমন করলেন, তখন তারা বলল, এটাতো প্রকাশ্য জাদু মাত্র’ (ছফ ৬১/৬)।
(ঙ) তাওরাত ও ইনজীলে ভবিষ্যদ্বাণী(بشارته صـ فى التوراة والإنجيل) :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আগমন সংবাদ তাওরাত-ইনজীলেও লিপিবদ্ধ ছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ يَتَّبِعُوْنَ الرَّسُوْلَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُوْنَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِيالتَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيْلِ ‘(এই কল্যাণ কেবল তাদেরই প্রাপ্য) যারা এই রাসূলের আনুগত্য করে যিনি নিরক্ষর নবী, যার বিষয়ে তারা তাদের কিতাব তাওরাত ও ইনজীলে লিপিবদ্ধ পেয়েছে’ (আ‘রাফ ৭/১৫৭) সেকারণ তাঁর আগমন বিষয়ে ইহূদী-নাছারা পন্ডিতগণ আগেভাগেই জানতেন (বাক্বারাহ ২/৮৯) তারা তাঁকে চিনতেন যেমন নিজের সন্তানদের তারা চিনতেন’।[9]
(চ) আহলে কিতাবগণের প্রতীক্ষিত নবী (نبى منتظر لأهل الكتاب) :
মক্কায় অরাক্বা বিন নওফাল, শামে বাহীরা প্রমুখ পন্ডিতগণ তাঁকে দেখেই চিনতে পেরেছিলেন। সেকারণ হাবশার সম্রাট নাজাশী, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস ও মিসররাজ মুক্বাউক্বিস সকলেই তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ করেছিলেন। যারা সবাই খ্রিষ্টান ছিলেন। শেষনবীর সন্ধানেই সুদূর পারস্যের ইছফাহান হ’তে অগ্নিপূজক সালমান ফারেসী খ্রিষ্টান পাদ্রীদের কাছে শুনে দীর্ঘদিন সন্ধান শেষে মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট ১ম হিজরীতে ইসলাম কবুল করেন।[10] ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, আহলে কিতাবদের নিকটে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পরিচিতি অবিরত ধারায় বর্ণিত ছিল।[11] আহলে কিতাবদের নিকট থেকে ইয়াছরিবের অধিবাসীরা আগে থেকেই শেষনবীর আগমন ও তাঁর নাম-চেহারা ও পরিচিতি সম্পর্কে জানত (ইবনু হিশাম ১/২৩২) এমনকি তারা শেষনবীর আগমনের পর তাকে সাথে নিয়ে অবাধ্য ইয়াছরেবীদের উপর জয়লাভ করবে ও তাদের হত্যা করবে বলে হুমকি দিত।[12] আর সেকারণেই তারা মক্কায় এসে আগেই ইসলাম কবুল করে এবং তাদের আহবানে সাড়া দিয়ে রাসূল (ছাঃ) মদীনায় হিজরত করেন।
তাদের উক্ত আকাংখার বিষয়টি প্রকাশ করে আল্লাহ বলেন,وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُواكَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِينَ- ‘আর যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ হ’তে কিতাব (কুরআন) এসে গেল, যা সত্যায়নকারী ছিল (তওরাত-ইনজীলের), যা তাদের কাছে রয়েছে। অথচ ইতিপূর্বে তারা (শেষনবীর মাধ্যমে) কাফেরদের উপর বিজয় কামনা করত। অবশেষে যখন তাদের নিকট পরিচিত সেই কিতাব (কুরআন) এসে গেল তারা তাকে অস্বীকার করল। অতএব কাফেরদের উপরে আল্লাহর অভিসম্পাৎ’ (বাক্বারাহ ২/৮৯)।
এক্ষণে আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর দীর্ঘ তেইশ বছরের নবুঅতী জীবন বিবৃত করব। যার মধ্যে মাক্কী জীবনের তের বছর ছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে দাওয়াতী জীবন এবং শেষ দশ বছরের মাদানী জীবন ছিল তাওহীদ ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য দাওয়াত ও জিহাদের সমন্বিত কষ্টকর জীবন।
দাওয়াতী জীবন:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
নবীদের দাওয়াতকে গোপনে ও প্রকাশ্যে দু’ভাগে ভাগ করার কোন সুযোগ নেই। কেননা তাঁরা নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রকাশ্যভাবেই নবুঅতের দাবী নিয়ে দাওয়াত শুরু করেন। প্রত্যেক নবীই তার কওমকে বলেছেন, يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ ‘হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই’।[1] আমাদের নবীও বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল..’ (আ‘রাফ ৭/১৫৮)। তবে এটাই স্বাভাবিক যে, আপনজনদের নিকটেই প্রথমে দাওয়াত দেওয়া হয়। আর এই দাওয়াত স্থান-কাল-পাত্রভেদে কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে কখনো সর্বসমক্ষে হয়ে থাকে। ইবনু ইসহাক বিনা সনদে উল্লেখ করেন, তার নিকটে এই মর্মে খবর পৌঁছেছে যে, আল্লাহ তাকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দানের আগ পর্যন্ত রাসূল (ছাঃ) তিন বছর গোপনে দাওয়াত দিয়েছেন’ (ইবনু হিশাম ১/২৬২)। ইবনু সা‘দ এবং ওয়াক্বেদীও সে কথা বলেছেন। বালাযুরী এটাকে চার বছর বলেছেন। অনেক জীবনীকার এই মেয়াদের উপর ভিত্তি করে শেষনবী (ছাঃ)-এর দাওয়াতের মেয়াদ নির্দিষ্ট করেছেন। অথচ দাওয়াতের এইরূপ সীমা নির্ধারণ করার কোন দলীল নেই’ (মা শা-‘আ ২৯ পৃঃ)।
যেকোন সংস্কার আন্দোলন শুরু করতে গেলে প্রথমে তা গোপনেই শুরু করতে হয়। পুরা সমাজ যেখানে ভোগবাদিতায় ডুবে আছে, সেখানে ভোগলিপ্সাহীন আখেরাতভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দাওয়াত নিয়ে অগ্রসর হওয়া সাগরের স্রোত পরিবর্তনের ন্যায় কঠিন কাজ। এ পথের দিশা দেওয়া এবং এ পথে মানুষকে ফিরিয়ে আনা দু’টিই কঠিন বিষয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সেকাজের জন্যই আদিষ্ট হয়েছিলেন। অহী প্রাপ্ত হওয়ার পরেই খাদীজার সাথে তিনি সে সময়ে মক্কার বয়োবৃদ্ধ সেরা বিদ্বান অরাক্বা বিন নওফাল-এর কাছে যান। তিনি সবকিছু অবগত হওয়ার পর তাঁকে ভবিষ্যৎ বিরোধিতা ও আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দেন। ফলে তিনি প্রথমে গোপনে দাওয়াত শুরু করেন। যদিও খাদীজা, আলী, আবুবকর, ওছমান প্রমুখদের মত মক্কার সেরা ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণের ইসলাম কবুলের পর এই দাওয়াত আদৌ গোপন থাকেনি।
প্রাথমিক মুসলমানগণ ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
প্রথমেই তাঁর দাওয়াত কবুল করেন মহিলাদের মধ্যে তাঁর পুণ্যশীলা স্ত্রী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাঃ)। অতঃপর গোলামদের মধ্যে তাঁর মুক্তদাস যায়েদ বিন হারেছাহ, শিশু-কিশোরদের মধ্যে আলী ইবনু আবী তালিব এবং বয়স্কদের মধ্যে নিকটতম বন্ধু আবুবকর ইবনু আবী কুহাফাহ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)।
অতঃপর আবুবকর (রাঃ)-এর দাওয়াতে ইসলাম কবুল করেন একে একে ওছমান, যুবায়ের, আব্দুর রহমান বিন ‘আওফ, সা‘দ বিন আবু ওয়াক্কাছ ও তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)। এছাড়া আবুবকরের স্ত্রী উম্মে রূমান ও মা বার্রাহ এবং দুই মেয়ে আসমা ও আয়েশা। এছাড়া আবুবকর (রাঃ) কর্তৃক ৭ জন মুক্তদাস-দাসী হ’লেন, ‘আমের বিন ফুহাইরা, উম্মে উবাইস, যিন্নীরাহ, নাহদিয়াহ ও তার মেয়ে এবং বনু মুআম্মাল-এর জনৈকা দাসী এবং বেলাল বিন রাবাহ।[1]
অতঃপর একে একে ইসলাম কবুল করেন আবু ওবায়দাহ ইবনুল জার্রাহ, আবু সালামাহ, আরক্বাম, ওছমান বিন মায‘ঊন ও তাঁর দুই ভাই কুদামাহ ও আব্দুল্লাহ, ওবায়দুল্লাহ বিন হারেছ, সাঈদ বিন যায়েদ ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বিন খাত্ত্বাব (ওমরের বোন), খাববাব ইবনুল আরাত, ওমায়ের বিন আবু ওয়াক্কাছ, আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ, মাসঊদ বিন রাবী‘আহ আল-ক্বারী, সালীত্ব বিন আমর ও তাঁর ভাই হাতেব বিন আমর, ‘আইয়াশ বিন আবু রাবী‘আহ ও তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে সালামাহ, খুনাইস বিন হুযাফাহ, ‘আমের বিন রবী‘আহ, আব্দুল্লাহ বিন জাহশ, জা‘ফর বিন আবু তালিব ও তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমায়েস, নু‘আইম বিন আব্দুল্লাহ, খালেদ বিন সাঈদ ইবনুল ‘আছ ও তাঁর স্ত্রী উমাইনাহ বিনতে খালাফ, হাতেব বিন আমর, আবু হুযায়ফা বিন উৎবা, ওয়াক্বিদ বিন আব্দুল্লাহ, খালেদ বিন বুকায়ের ও তার ভাইগণ ‘আমের, ‘আক্বিল ও ইয়াস, ‘আম্মার, পিতা ইয়াসির ও মাতা সুমাইয়া, ছুহায়েব রূমী, আমর বিন আবাসাহ, মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ, ‘আফীফ বিন ক্বায়েস।
খাদীজা (রাঃ)-এর পরে রাসূল (ছাঃ)-এর চাচা আববাস-এর স্ত্রী উম্মুল ফযল ও তাঁর গোলাম আবু রাফে‘ ইসলাম কবুল করেন। ইবনু ইসহাকের বর্ণনা মতে প্রথম তিন বছরে উপরোক্ত ব্যক্তিগণ ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ইসলাম প্রকাশ্য হয়ে পড়ে ও তা নিয়ে লোকদের মধ্যে আলোচনা হ’তে থাকে’।[2]
উপরে যাদের নামের তালিকা দেওয়া হ’ল, তারা কুরায়েশ বংশের প্রায় সকল শাখা-প্রশাখার সাথে সরাসরি কিংবা আত্মীয়তাসূত্রে যুক্ত ছিলেন। কুরায়েশ নেতাদের কাছে এঁদের খবর পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তারা এটাকে স্রেফ ব্যক্তিগত ধর্মাচার মনে করেছিলেন।[3] ফলে তাদের অনেকেই কুরায়েশ নেতাদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত হন।
ছালাতের নির্দেশনা:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
যেকোন সংস্কার আন্দোলনের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আক্বীদার মযবুতী। আর এই মযবুতীর জন্য চাই নিয়মিত আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ। যা সর্বদা সংস্কারককে তার আদর্শমূলে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে। সেকারণ অধ্যাত্ম সাধনার প্রাথমিক কাজ হিসাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবুঅতের শুরু থেকেই সকাল ও সন্ধ্যায় দু’বার ছালাত আদায়ের নির্দেশনা দান করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ ‘তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসা জ্ঞাপন কর সন্ধ্যায় ও সকালে’ (মুমিন/গাফের ৪০/৫৫)।
প্রথম কুরআন নাযিলের পর জিব্রীলের মাধ্যমে তিনি ওযূ ও ছালাত শিখেন।[1] হিজরতের স্বল্পকাল পূর্বে মে‘রাজ সংঘটিত হবার আগ পর্যন্ত ফজরের দু’রাক‘আত ও আছরের দু’রাক‘আত করে ছালাত আদায়ের নিয়ম জারী থাকে। আয়েশা (রাঃ) বলেন, শুরুতে ছালাত বাড়ীতে ও সফরে ছিল দু’ দু’ রাক‘আত করে।[2] এছাড়া রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য ‘অতিরিক্ত’ (نَافِلَةً) ছিল তাহাজ্জুদের ছালাত (ইসরা/বনু ইস্রাঈল ১৭/৭৯)। সেই সাথে ছাহাবীগণও নিয়মিতভাবে রাত্রির নফল ছালাত আদায় করতেন।[3] অতঃপর মি‘রাজের রাত্রিতে নিয়মিতভাবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করা হয়।[4] উল্লেখ্য যে, পূর্বেকার সকল নবীর সময়ে ছালাত, ছিয়াম ও যাকাত ফরয ছিল। তবে সেসবের ধরন ও পদ্ধতি ছিল কিছুটা পৃথক।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর সাথীগণ প্রথম দিকে গোপনে এই ছালাত আদায় করতেন এবং লোকদেরকে গাছ, পাথর, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদির উপাসনা পরিত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিতেন। তিনি কখনো কখনো সাথীদের নিয়ে পাহাড়ের গুহাতে গোপনে ছালাত আদায় করতেন। একদিন আবু ত্বালিব স্বীয় পুত্র আলী ও ভাতিজা মুহাম্মাদকে এটা আদায় করতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করেন। সবকিছু শুনে বিষয়টির আধ্যাত্মিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি তাদেরকে উৎসাহিত করেন।[5]
উর্দূ কবি বলেন,
ہوا كو پهرانا دشور ، موج كو الٹانا دشور
ليكن اتنا نہ جتنا، بهٹكى ہوئى قوم كو راه پر لانا دشور
‘বায়ু প্রবাহ ফিরানো কঠিন, স্রোতকে উল্টানো কঠিন’। ‘কিন্তু অত কঠিন নয়, যত না কঠিন একটা পথভ্রষ্ট জাতিকে সুপথে ফিরিয়ে আনা’।
হজ্জের মৌসুমে রাসূল (ছাঃ)-এর দাওয়াত:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
যথাসময়ে হজ্জের মৌসুম এসে গেল। হজ্জের মাসের আগে-পিছে দু’মাস হ’ল হারামের মাস। এ তিন মাস মারামারি-কাটাকাটি নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হজ্জে আগত মেহমানদের তাঁবুতে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকেন। ওদিকে অলীদের পরামর্শ মতে আবু লাহাবের নেতৃত্বে পরিচালিত গীবতকারী দল সবার কাছে গিয়ে রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে বিভিন্ন অপবাদ প্রচার করতে থাকে এবং শেষে বলে আসে যে, সে একজন জাদুকর। তার কথা শুনলেই জাদুগ্রস্ত হয়ে যেতে হবে। অতএব কেউ যেন তার ধারে-কাছে না যায়। খোদ আবু লাহাব নির্লজ্জের মত রাসূল (ছাঃ)-এর পিছে পিছে ঘুরতে লাগল। রাসূল (ছাঃ) যেখানেই যান, সেখানেই সে গিয়ে বলে يَا أَيُّهَا النَّاسُ لاَ تُطِيعُوهُ فَإِنَّهُ صَابِىءٌ كَذَّابٌ ‘হে জনগণ! তোমরা এর কথা শুনো না। সে ধর্মত্যাগী মহা মিথ্যুক’ শুধু তাই নয়, সে উপরোক্ত গালি দিয়ে হজ্জ মৌসুমের বাইরে যুল-মাজায বাজারে রাসূল (ছাঃ)-এর পায়ে পাথর ছুঁড়ে মেরেছিল। যাতে তাঁর দু’গোড়ালী রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল।[2]
যুগে যুগে বাতিলপন্থীরা এভাবে হকপন্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে। আজও করে যাচ্ছে। যাতে লোকেরা হক কবুল করা হ’তে বিরত থাকে।
লাভ ও ক্ষতি ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
এই ব্যাপক অপপ্রচারের ফলে রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য লাভ ও ক্ষতি দু’টিই হ’ল। লাভ হ’ল এই যে, তাঁর নবুঅত দাবীর কথা সর্বত্র প্রচারিত হ’ল। যা সুদূর ইয়াছরিবের কিতাবধারী ইহূদী-নাছারাদের কানে পৌঁছে গেল। এতে তারা বুঝে নিল যে, তাওরাত-ইনজীলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী আখেরী নবীর আগমন ঘটেছে। ফলে দ্বীনদার লোকদের মধ্যে তাঁর প্রতি ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হ’ল।
পক্ষান্তরে ক্ষতি হ’ল এই যে, কেউ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিল না। বরং অনেকের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হ’ল। সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক ছিল আবু লাহাবের কুৎসা রটনা ও নোংরা প্রচারণা। কেননা তিনি ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর আপন চাচা, নিকটতম প্রতিবেশী, তাঁর দুই মেয়ের সাবেক শ্বশুর এবং সুপরিচিত নেতা ও বড় ব্যবসায়ী। তার কথা সবাই বিশ্বাস করে নিল। যে কারণে দীর্ঘ প্রায় তিন মাসব্যাপী দিন-রাতের দাওয়াত বাহ্যতঃ নিষ্ফল হ’ল।
নাচ-গানের আসর করা:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
গল্পের আসর জমানো এবং গান-বাজনা ও নৃত্য-গীতের অনুষ্ঠান করা, যাতে মানুষ মুহাম্মাদের কথা না শোনে। এজন্য অন্যতম কুরায়েশ নেতা ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী নযর বিন হারেছ তৎকালীন সমৃদ্ধ শহর ইরাকের ‘হীরা’ নগরীতে চলে যান এবং সেখান থেকে পারস্যের প্রাচীন রাজা-বাদশাদের কাহিনী, রুস্তম ও ইস্ফিনদিয়ারের বীরত্বের কাহিনী শিখে এসে মক্কায় বিভিন্ন স্থানে গল্পের আসর বসাতে শুরু করেন। যেখানেই রাসূল (ছাঃ) মানুষকে জাহান্নামের ভয় ও জান্নাতের সুখ-শান্তির কথা শুনিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন, সেখানেই নযর বিন হারেছ গিয়ে উক্ত সব কল্প-কাহিনী শুনিয়ে বলতেন, এগুলো কি মুহাম্মাদের কাহিনীর চেয়ে উত্তম নয়? এতেও তিনি ক্ষান্ত না হয়ে অনেকগুলি সুন্দরী দাসী খরিদ করেন, যারা নৃত্য-গীতে পারদর্শী ছিল। তিনি তাদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে নাচ-গানের আসর বসাতেন এবং মানুষকে সেখানে আকৃষ্ট করতেন। এমনকি কোন লোক মুহাম্মাদের অনুসারী হয়েছে জানতে পারলে তিনি ঐসব সুন্দরীদের তার পিছনে লাগিয়ে দিতেন এবং তাকে ফিরিয়ে আনার যেকোন পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন’ (ইবনু হিশাম ১/৩০০)।
উপরোক্ত ঘৃণ্য ক্রিয়া-কলাপের প্রেক্ষিতেই নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَّيَتَّخِذَهَا هُزُواً أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ- (لقمان ৬)-
‘লোকেদের মধ্যে একটা শ্রেণী আছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অজ্ঞতাবশে অলীক কল্প-কাহিনী খরীদ করে এবং আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (লোকমান ৩১/৬)।
আধুনিক যুগের মিথ্যাচার ও খেল-তামাশার বাহন স্বরূপ ইসলাম বিরোধী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া সমূহ এ আয়াতের আওতাভুক্ত। সেযুগের চেয়ে এ যুগে এসবের ক্ষতি শতগুণ বেশী। কেননা সে যুগে এসব যে স্থানে প্রদর্শিত হ’ত, সে স্থানের দর্শক ও শ্রোতারাই কেবল সংক্রমিত হ’ত। কিন্তু আধুনিক যুগে এর মন্দ প্রতিক্রিয়া হয় সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি দর্শক ও শ্রোতার মধ্যে। সেকারণ জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এবং পরিবারপ্রধান ও সমাজ ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের এ বিষয়ে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
ইহূদী পন্ডিতদের মাধ্যমে সরাসরি নবীকে পরীক্ষা করা:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মদীনার কপট ইহূদী পন্ডিতরা মক্কায় এসে রাসূল (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করল, বলুন তো শামে বসবাসকারী কোন নবীর ছেলেকে মিসরে বহিষ্কার করা হয় এবং তিনি সেই শোকে কেঁদে অন্ধ হয়ে যান? ইহূদীরা এঘটনা জানত তাওরাতের মাধ্যমে যা ছিল হিব্রু ভাষায়। মক্কার লোকেরা হিব্রু জানত না। এমনকি তারা আরবীতেও লেখাপড়া জানত না। তারা ইউসুফ নবী সম্পর্কে কিছুই জানত না। এ প্রশ্ন ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। ফলে ইউসুফের কাহিনী পূরাটাই একত্রে একটি সূরায় নাযিল হয়। যা অন্য নবীদের বেলায় হয়নি (তাফসীর ইবনু জারীর হা/১৮৭৮৬; কুরতুবী প্রভৃতি)।
চাঁদ দ্বিখন্ডিত করণের প্রস্তাব:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
সবকিছুতে ব্যর্থ হয়ে সবশেষে ইহূদী পন্ডিতেরা কুরায়েশ নেতাদের একটা বিস্ময়কর কৌশল শিখিয়ে দিল। তারা বলল, মুহাম্মাদ জাদুকর কি-না, যাচাইয়ের একটা প্রকৃষ্ট পন্থা এই যে, জাদুর প্রভাব কেবল যমীনেই সীমাবদ্ধ থাকে। আসমানে এর কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। অতএব তোমরা মুহাম্মাদকে বল, সে চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করুক। সম্ভবতঃ হযরত মূসা (আঃ) কর্তৃক লাঠির সাহায্যে নদী বিভক্ত হওয়ার মু‘জেযা থেকেই চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করার চিন্তাটি ইহূদীদের মাথায় এসে থাকবে। অথচ নদী বিভক্ত করার চাইতে চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করা কতই না কঠিন বিষয়। কেননা এটি দুনিয়ার এবং অন্যটি আকাশের। কুরায়েশ নেতারা মহা খুশীতে বাগবাগ হয়ে গেল এই ভেবে যে, এবার নির্ঘাত মুহাম্মাদ কুপোকাৎ হবে। তারা দল বেঁধে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে এক চন্দ্রোজ্জ্বল রাত্রিতে উক্ত প্রশ্ন করল। ঐ সময় সেখানে হযরত আলী, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ, জুবায়ের ইবনু মুত্ব‘ইম প্রমুখ ছাহাবীগণ উপস্থিত ছিলেন। এতদ্ব্যতীত বহু ছাহাবী উক্ত বিষয়ে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যে কারণে হাফেয ইবনু কাছীর এতদসংক্রান্ত হাদীছসমূহকে ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ভুক্ত বলেছেন (ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা ক্বামার) কুরায়েশ নেতাদের দাবী মোতাবেক আল্লাহর হুকুমে রাসূল (ছাঃ)-এর উক্ত মু‘জেযা প্রদর্শিত হ’ল। মুহূর্তের মধ্যে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিমে ছিটকে পড়ল। উভয় টুকরার মাঝখানে ‘হেরা’ পর্বত আড়াল হয়ে গেল। অতঃপর পুনরায় দুই টুকরা এসে যুক্ত হ’ল। এ সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মিনা-তে ছিলেন। ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) কর্তৃক ছহীহায়নের বর্ণনায় এসেছে যে, এরপর রাসূল (ছাঃ) উপস্থিত নেতাদের বললেন, إشْهَدُوْا ‘তোমরা সাক্ষী থাক’ ইবনু মাস‘ঊদ ও ইবনু ওমর (রাঃ) কর্তৃক ছহীহ মুসলিম-এর বর্ণনায় এসেছে যে, ঐসময় আল্লাহকে সাক্ষী রেখে রাসূল (ছাঃ) বলেন, اللَّهُمَّ اشْهَدْ ‘হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক’।[2] এতে অনুমিত হয় যে, ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর সাথে ঐ সময় ইবনু ওমর (রাঃ) হাযির ছিলেন এবং উভয়ে উক্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছরের মত। ঘটনাটি ৯ম নববী বর্ষে ঘটে।[3] উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে সূরা ক্বামার নাযিল হয়। যার শুরু হ’ল اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ ‘ক্বিয়ামত আসন্ন। চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে’ (ক্বামার ৫৪/১) এত বড় ঘটনা চাক্ষুষ দেখা সত্ত্বেও কুরায়েশ নেতারা ঈমান আনলেন না। পরে বিভিন্ন এলাকা হ’তে আগত লোকদের কাছেও তারা একই ঘটনা শোনেন। ইবনু মাসঊদ বলেন, তারা বললেন, এটা আবু কাবশার পুত্রের (মুহাম্মাদের) জাদু। সে তোমাদের জাদু করেছে। অতএব তোমরা বহিরাগত লোকদের জিজ্ঞেস কর। কেননা মুহাম্মাদ একসঙ্গে সবাইকে জাদু করতে পারবে না। অতএব বহিরাগতরা বললে সেটাই ঠিক। নইলে এটা স্রেফ জাদু মাত্র। অতঃপর চারদিক থেকে আসা মুসাফিরদের জিজ্ঞেস করলেন। তারা সবাই এ দৃশ্য দেখেছেন বলে সাক্ষ্য দেন’।[4] কিন্তু যিদ ও অহংকার তাদেরকে ঈমান আনা হ’তে বিরত রাখলো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, وَإِن يَّرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُّسْتَمِرٌّ، وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءَهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُّسْتَقِرٌّ، ‘তারা যদি কোন নিদর্শন (যেমন চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করণ) দেখে, তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে যে, এটা তো চলমান জাদু’। ‘তারা মিথ্যারোপ করে এবং নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। অথচ প্রত্যেক কাজের ফলাফল (ক্বিয়ামতের দিন) স্থিরীকৃত হবে (ক্বামার ৫৪/২-৩) তারীখে ফিরিশতায় বর্ণিত হয়েছে যে, চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার এই দৃশ্য ভারতের মালাবারের জনৈক মহারাজা স্বচক্ষে দেখেন এবং তা নিজের রোজনামচায় লিপিবদ্ধ করেন। পরে আরব বণিকদের মুখে ঘটনা শুনে তখনকার রাজা ‘সামেরী’ উক্ত রোজনামচা বের করেন। অতঃপর তাতে ঘটনার সত্যতা দেখে তিনি মুসলমান হয়ে যান। যদিও সামরিক নেতা ও সমাজনেতাদের ভয়ে তিনি ইসলাম গোপন রাখেন’।[5] ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই চন্দ্রে প্রথম পদাপর্ণকারী দলের নেতা নেইল আর্মষ্ট্রং স্বচক্ষে চন্দ্রপৃষ্ঠের বিভক্তি রেখা দেখে বিস্ময়াভিভূত হন এবং ইসলাম কবুল করেন। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের ভয়ে তিনি একথা কয়েক বছর পরে প্রকাশ করেন।[6]চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করা ছাড়াও রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মু‘জেযা প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু এগুলি ছিল কেবল হঠকারীদের অহংকার চূর্ণ করার জন্য। এর দ্বারা তারা কখনোই হেদায়াত লাভ করেনি। যদিও এর ফলে দ্বীনদারগণের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে।
উদ্ভট দাবী সমূহ পেশ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
যেমন (ক) উৎবা, শায়বাহ, আবু সুফিয়ান, নযর বিন হারেছ, আবুল বাখতারী, আসওয়াদ বিন মুত্ত্বালিব, অলীদ বিন মুগীরাহ, আবু জাহল, উমাইয়া বিন খালাফ, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী উমাইয়া সহ ১৪জন কুরায়েশ নেতা রাসূল (ছাঃ)-কে মাগরিবের পর কা‘বা চত্বরে ডাকিয়ে এনে বললেন, হে মুহাম্মাদ! তুমি তোমার বংশের উপরে যে বিপদ ডেকে এনেছ, সমগ্র আরবে কেউ তা আনেনি। لَقَدْ شَتَمْتَ الْآبَاءَ، وَعِبْتَ الدِّينَ، وَشَتَمْتَ الْآلِهَةَ، وَسَفَّهْتَ الْأَحْلاَمَ، وَفَرَّقْتَ الْجَمَاعَةَ ‘তুমি তোমার বাপ-দাদাকে গালি দিয়েছ, তাদের দ্বীনকে দোষারোপ করেছ, উপাস্যদের গালি দিয়েছ, জ্ঞানীদের বোকা ধারণা করেছ এবং আমাদের জামা‘আতকে বিভক্ত করেছ’ এক্ষণে যদি তুমি এগুলো পরিত্যাগের বিনিময়ে মাল চাও, মর্যাদা চাও, নেতৃত্ব চাও, শাসন ক্ষমতা চাও, তোমার জিন ছাড়ানোর চিকিৎসক চাও, সবই তোমাকে দিব। জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ আমাকে আপনাদের নিকট রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন। আমি আপনাদের নিকট রিসালাত পৌঁছে দিয়েছি। যদি আপনারা সেটা কবুল করেন, তাহ’লে দুনিয়া ও আখেরাতে আপনাদের কল্যাণ হবে। আর যদি অস্বীকার করেন, তাহ’লে আমি আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ করব। যতক্ষণ না তিনি আমার ও আপনাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেন’ তখন নেতারা বললেন, তুমি যদি আমাদের কোন কথাই না শোন, তাহ’লে তোমার প্রভুকে বল যেন (১) তিনি মক্কার পাহাড়গুলি সরিয়ে এস্থানটিকে সমতল ভূমিতে পরিণত করে দেন। কেননা তুমি জান মক্কার চাইতে সংকীর্ণ শহর আর নেই। (২) তোমার প্রভু যেন এখানে নদীসমূহ প্রবাহিত করে দেন, যেমন শাম ও ইরাকে রয়েছে। (৩) আমাদের সাবেক নেতা কুছাই বিন কিলাবকে জীবিত করে এনে দাও। যার কাছে শুনব তোমাকে যে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তা সত্য কি-না। (৪) তোমার প্রভু যেন তোমার সঙ্গে একজন ফেরেশতা পাঠান, যিনি তোমার ব্যাপারে সত্যায়ন করবেন। (৫) তুমি তাঁর নিকটে প্রার্থনা কর, যেন তোমার জন্য বাগ-বাগিচা এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য মন্ডিত প্রাসাদ বানিয়ে দেন। (৬) আমরা তোমার উপরে ঈমান আনিনি বিধায় তোমার প্রভু যেন আমাদের উপর আকাশকে টুকরা-টুকরা করে গযব হিসাবে নামিয়ে দেন, যেমনটি তুমি ধারণা করে থাক। (৭) তাদের একজন বলল, আমরা কখনই তোমার উপরে ঈমান আনবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে না নিয়ে আসবে। (৮) আরেকজন নেতা রাসূল (ছাঃ)-এর ফুফাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনু আবী উমাইয়া বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা কখনই তোমার উপরে ঈমান আনবো না, যতক্ষণ না তুমি আসমান থেকে সিঁড়ি নামিয়ে দিবে। অতঃপর তুমি তাতে আরোহন করবে ও আল্লাহর কাছে চলে যাবে। অতঃপর সেখান থেকে চারজন ফেরেশতাকে সাথে নিয়ে আসবে, যে তোমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিবে যে, তুমি যা বল, তা সত্য।
দাবীগুলির বর্ণনা এবং তার সনদ যঈফ হ’লেও এগুলির বর্ণনা ও এসবের জবাব কুরআনে এসেছে। এতেই বুঝা যায় যে, ঘটনা সঠিক ছিল। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَقَالُوْا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا- أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلاَلَهَا تَفْجِيرًا- أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللهِ وَالْمَلاَئِكَةِ قَبِيلاَ- أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفٍ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلاَّ بَشَرًا رَسُولاً-
‘তারা বলল, আমরা কখনোই তোমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করব না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি থেকে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করে দিবে’ (৯০)। ‘অথবা তোমার জন্য খেজুর ও আঙ্গুরের বাগিচা হবে। যার মধ্যে তুমি ব্যাপকভাবে (শাম ও ইরাকের ন্যায়) নদী-নালা প্রবাহিত করাবে’ (৯১)। ‘অথবা আকাশকে টুকরা টুকরা করে আমাদের উপরে নিক্ষেপ করবে যেমনটা তুমি ধারণা ব্যক্ত করে থাক। অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসবে’ (৯২)। ‘অথবা তোমার একটি স্বর্ণমন্ডিত প্রাসাদ হবে। অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে। অবশ্য আমরা তোমার আকাশে আরোহণে বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না তুমি সেখান থেকে (তোমার সত্যতার পক্ষে) আমাদের উপর কোন কিতাব নাযিল করাবে, যা আমরা পড়ে দেখব। তুমি বল, আমার প্রভু (এইসব থেকে) পবিত্র। আমি একজন মানুষ রাসূল ব্যতীত কিছুই নই’ (ইসরা ১৭/৯০-৯৩) কাফেররা মানুষ রাসূল চায়নি, ফেরেশতা রাসূল চেয়েছিল। যার প্রতিবাদে এক আয়াত পরেই আল্লাহ বলেন, قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَسُولاً ‘যদি ফেরেশতারা যমীনে স্বচ্ছন্দে পদচারণা করতে পারত, তাহ’লে আমরা তাদের জন্য ফেরেশতা রাসূল পাঠাতাম’ (ইসরা ১৭/৯৫)।
মুসলমানদের মধ্যে যারা রাসূল (ছাঃ)-কে ‘নূরের নবী’ বলেন, তারা কি কাফেরদের ‘ফেরেশতা রাসূল’ দাবীর সাথে সুর মিলাচ্ছেন না? অতএব আল্লাহ নিরাকার। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। প্রত্যেক সৃষ্টিই আল্লাহর অংশ। রাসূল (ছাঃ) মানুষ নবী নন, তিনি নূরের নবী ইত্যাদি নষ্ট আক্বীদা থেকে প্রথমেই তওবা করা আবশ্যক।
ইবনু কাছীর বলেন, কুরায়েশ নেতারা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এগুলি দাবী করেছিল। যদি আল্লাহ এর মধ্যে তাদের কোন কল্যাণ আছে বলে জানতেন, তাহলে অবশ্যই তা কবুল করতেন। কিন্তু তিনি ভালভাবেই অবহিত ছিলেন যে, তারা এসব প্রশ্ন করছে স্রেফ কুফরী ও হঠকারিতা বশে। সেকারণ তিনি তা কবুল করেননি (ইবনু কাছীর, তাফসীর উক্ত আয়াত)।
ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, কুরায়েশরা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে দাবী করল যে, আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকটে দো‘আ করুন। যেন তিনি ছাফা পাহাড়কে আমাদের জন্য স্বর্ণ বানিয়ে দেন। তাহ’লে আমরা ঈমান আনব। রাসূল (ছাঃ) তাদের দাবী মোতাবেক দো‘আ করলেন। অতঃপর জিব্রীল (আঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে তাঁর প্রতি আল্লাহ তা‘আলার সালাম পৌঁছে দিয়ে বললেন, আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি চাইলে আমি তাদের জন্য ছাফা পাহাড়কে স্বর্ণে রূপান্তরিত করব। কিন্তু এরপর যারা কুফরী করবে, তাদেরকে আমি এমন শাস্তির সম্মুখীন করব, যা আমি পৃথিবীর অন্য কাউকে দেইনি। আর যদি তুমি চাও তবে আমি তওবা ও রহমতের দুয়ার খুলে দিব। তখন রাসূল (ছাঃ) তওবা ও রহমতই কামনা করলেন। অতঃপর আল্লাহ নাযিল করলেন, وَمَا مَنَعَنَا أَنْ نُرْسِلَ بِالْآيَاتِ إِلاَّ أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُونَ وَآتَيْنَا ثَمُودَ النَّاقَةَ مُبْصِرَةً فَظَلَمُوا بِهَا وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلاَّ تَخْوِيفًا ‘পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ কর্তৃক নিদর্শন সমূহকে অস্বীকার করাই আমাদেরকে (তোমাদের প্রতি) নিদর্শন প্রেরণ করা হ’তে বিরত রেখেছে। আমরা ছামূদ কওমের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন স্বরূপ উষ্ট্রী পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তারা তার প্রতি অত্যাচার করেছিল (অর্থাৎ হত্যা করেছিল) আর আমরা কেবল ভয় প্রদর্শনের জন্যেই নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করে থাকি’ (ইসরা ১৭/৫৯)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর নানামুখী অত্যাচার:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
সমস্ত যুক্তি, কৌশল ও আপোষ প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর কুরায়েশ নেতারা এবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপরে সরাসরি অত্যাচারের সিদ্ধান্ত নিল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দিক থেকে লোকদের ফিরিয়ে আনার জন্য কুরায়েশ নেতারা বিদ্রুপ করে বলে, আমরাও এরূপ বলতে পারি। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا قَالُوْا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَاءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هَـذَا إِنْ هَـذَا إِلاَّ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ- ‘যখন তাদের নিকটে আমাদের আয়াত সমূহ পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনেছি। ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি। এসব তো পূর্ববর্তীদের উপকথা ভিন্ন কিছুই নয়’ (আনফাল ৮/৩১)।
উক্ত আয়াতে কাফেররা ‘কুরআনকে পুরাকালের কাহিনী এবং ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি’ বলে দম্ভ প্রকাশ করেছে। অথচ অনুরূপ একটি কুরআন বা তার মত দু’একটি সূরা বা আয়াত জিন-ইনসান সকলকে একত্রিত হয়ে রচনা করে আনার জন্য মক্কায় পাঁচবার[1] এবং মদীনায় একবার(বাক্বারাহ ২/২৩-২৪) সহ মোট ছয়বার কাফেরদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু সে যুগে ও এ যুগে কেউ সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেনি। বরং দেখা গেছে যে, সে যুগে ঐসব নেতারাই গোপনে রাতের অন্ধকারে বাইরে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের ছালাতে রাসূল (ছাঃ)-এর কুরআন তেলাওয়াত শুনত। আবু সুফিয়ান, নযর বিন হারেছ, আখনাস বিন শারীক্ব, আবু জাহল প্রমুখ নেতারা একে অপরকে না জানিয়ে গোপনে একাজ করত’ (ইবনু হিশাম ১/৩১৫-১৬)। কিন্তু যখন তারা তাদের জনগণের সামনে যেত, তখন তাদের মন্তব্য পাল্টে যেত। কারণ তখন দুনিয়াবী স্বার্থ তাদেরকে সত্যভাষণ থেকে ফিরিয়ে রাখত। একই অবস্থা আজকালকের মুসলিম-অমুসলিম নেতাদের। যাদের অধিকাংশ রাসূল (ছাঃ) ও কুরআনের সত্যতাকে স্বীকার করে। কিন্তু বাস্তবে তা মানতে রাযী হয় না স্রেফ দুনিয়াবী স্বার্থের কারণে।
এভাবে কাফেররা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত নানারূপ মানসিক কষ্ট দেয়। এ সময় আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُوْلُوْنَوَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيْلاً ‘তারা যেসব কথা বলে, তাতে তুমি ছবর কর এবং তাদেরকে সুন্দরভাবে পরিহার করে চল’ (মুযযাম্মিল ৭৩/১০)। তিনি আরও বলেন,إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِئِيْنَ ‘বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমরাই তোমার জন্য যথেষ্ট’ (হিজর ১৫/৯৫)।
0 comments:
Post a Comment